- Advertisement -
ধানের মাজরা পোকা ও তার দমন ব্যবস্থাপনা
মাজরা পোকা ধান ফসলের কান্ডের অভ্যন্তরে ভক্ষণকারী একটি ক্ষতিকর পোকা। মাজরা পোকার কীড়া গাছের কান্ডের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে ও ভিতর থেকে কান্ডকে কুড়ে কুড়ে খায়। অনেকের ধারণা মাইজ বা মধ্যে আক্রমন করে বিধায় এর নাম মাজরা পোকা রাখা হয়েছে। মাজরা পোকার আক্রমণে সাধারণতঃ ১৩-২৬ ভাগ ফলন কম হতে পারে। ব্যাপক আক্রমণ হয়ে ৩০-৭০ ভাগ পর্যন্ত ফলনের ঘাটতি হতে পারে। বাংলাদেশে ধান ফসলের জন্য ক্ষতিকর তিনটি প্রজাতির মাজরার পোকা আছে। এগুলো হলো হলুদ মাজরা, কালমাথা মাজরা এবং গোলাপী মাজরা। এছাড়াও সাদা প্রজাতির মাজরা ইদানিং পাওয়া যাচ্ছে। তবে হলুদ মাজরা পোকা ধান ক্ষেতের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে থাকে।
পোকা পরিচিতি
মাজরার তিনটি প্রজাতির মধ্যে পার্থক্য হলো হলুদ মাজরা পোকার কীড়ার মাথা হলুদ বর্ণের, কালো মাথা মাজরা পোকার কীড়ার মাথা কালচে বর্ণের এবং গোলাপাী মাজরা পোকার কীড়ার মাথা গোলাপী বর্ণের হয়ে থাকে। হলুদ মাজরা পোকা দেখতে হলুদ বর্ণের হলেও পাখার একেবারে নিচের দিকে একটি করে কালো বর্ণের দাগ থাকে। কালো মাথা মাজরা পোকা বাদামী খূসর বর্ণের এবং গোলাপী মাজরা পোকার ঘাড়ের মধ্যে কেশর থাকে। মাজরা পোকার জীবন চক্র চারটি স্তরে বিভক্ত। যথাঃ ডিম, কীড়া, পুত্তলী এবং পূর্ণাঙ্গ পোকা। হলুদ মাজরা পোকার জীবনকাল প্রায় ৪০ থেকে ৬০ দিন। এক বছরে এরা প্রায় ৫ থেকে ৬ বার বংশবিস্তার করে থাকে। হলুদ মাজরা পোকা পাতার উপরের অংশে ডিম দেয়। ডিমগুলো হলুদ বর্ণের হয়। তাছাড়া হলুদ বর্ণের আশ দ্বারা ঢাকা থাকে। একটি হলুদ মাজরা পোকা প্রায় ৩০০টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। মাজরা পোকার ডিম ফুটে কীড়া হতে প্রায় ৬ থেকে ৮ দিন সময় লাগে। কীড়া অবস্থায় এরা প্রায় ২৪ থেকে ৩২ দিন পর্যন্ত সময় নেয়। পরবর্তীতে পুত্তলীতে রুপান্তরিত হয়। পুত্তলিগুলো গাছের গোড়ার দিকে অবস্থান করে। প্রায় ৬ থেকে ১২ দিন পুত্তলী অবস্থায় থেকে এরা পূর্ণাঙ্গ পোকায় রুপান্তরিত হয়।
ক্ষতির লক্ষণ
হলুদ মাজরা পোকা সাধারণতঃ আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমেই আক্রমণ করে। কালো মাথা মাজরা প্রধানতঃ বোরো এবং আউশ মৌসুমে আর গোলাপী মাজরা বোরো মৌসুমে আক্রমণ করে। এ পোকা ফসলে বীজতলা থেকে পাকা পর্যন্ত আক্রমণ করতে পারে। মাজরা পোকার শুধু কীড়া অবস্থায় ধান গাছের ক্ষতি করে থাকে। ডিম থেকে সদ্য ফোটা কীড়াগুলো দুই/চারদিন গাছের খোল পাতার মধ্যে থাকে। তারপর খেতে খেতে গাছের কান্ডের ভিতর চলে যায় এবং খাওয়ার এক পর্যায়ে গাছের মাঝখানের ডিগ কেটে ফেলে। ফলে ডিগ মারা যায়। মাজরা পোকা দুই ধরনের ক্ষতি করে থাকে।
প্রথমত মরা ডিগ বা ডেডহার্ট কুশি অবস্থায় আক্রমন হলে মরা ডিগ বা ডেড হার্ট লক্ষণ দেখা যায়। গাছের শীষ বা ছড়া আসার আগে ডিগ/মাইন কেটে দিলে সে গাছের আর ধানের শীষ বের হয় না।
দ্বিতীয়ত সাদা শীষ বা হোয়াইট হেড ধানের পিআই বা পেনিকেল ইনিশিয়াল বা থোড় অবস্থা থেকে ফুল হওয়া অবস্থা পর্যন্ত সময় যদি কীড়াগুলো ডিগ/মাইন কেটে দেয় তাহলে শীষের ধানগুলো চিটা হয়ে যায় এবং শীষ সাদা হয়ে যায়। কীড়াগুলো কান্ডের ভিতরের অংশ যদি সম্পূর্ণভাবে কেটে না দেয় তাহলে ধান গাছের আংশিক ক্ষতি হয়। মাজরা পোকার আক্রমণে সাধারণতঃ ১৩-২৬ ভাগ ফলন কম হতে পারে। ব্যাপক আক্রমণ হয়ে ৩০-৭০ ভাগ পর্যন্ত ফলনের ঘাটতি হতে পারে। এক্ষেত্রে হলুদ মাজরা পোকার একটি কীড়া একটি মাত্র কুশি খেয়ে নষ্ট করে বিধায় ধান ক্ষেতের বেশি ক্ষতি করে।
মাজরা পোকার ব্যবস্থাপনা
মাজরা পোকার ব্যবস্থাপনার জন্য ধান কাটার পর ক্ষেতের নাড়া ধ্বংস করা। এক্ষেত্রে পুড়িয়ে দিতে পারেন। রোগ প্রতিরোধী জাতের ব্যবহার। আগাম ও স্বল্প জীবনকালের ধান যেমন ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৬২ সহ বিনা ৭ ধান চাষ করতে পারেন। সমকালীন চাষাবাদ করতে পারেন। সমকালীন চাষাবাদ পোকা মাকড় ও রোগ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আক্রান্ত চারার মাথা কেটে ধ্বংস করতে পারেন। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার ব্যবহার পরিহার করতে হবে। মাজরা পোকার ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করা ও বাঁশের বুষ্টারে রাখতে পারেন। হাত জাল দিয়ে পুণাঙ্গ মাজরা পোকা ধরে মারতে পারেন। তাছাড়া ফিংলা বা ডাল পুতে পাখি বসার বন্দোবস্ত করে পোকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। মাজরা পোকার ডিম ও মথ হাত দিয়ে পিষে মারতে পারেন। মাজরার ডিমযুক্ত চারা রোপন না করা। মাঠে আক্রান্ত কুশি তুলে নষ্ট করা। মাঝে মাঝে আলোক ফাঁদের ব্যবস্থা করতে পারেন।
প্রাকৃতিকভাবেও মাজরা পোকা ধ্বংস করা যায়। লম্বাশুড় উড়চুঙ্গা, লম্বাশুড় ঘাসফড়িং, মিরিড বাগ এসব পোকা মাজরা পোকার ডিম খায়। এয়ার উইগ, ক্যারাবিড বিটল, মাইক্রোভেলিয়া, মেসোভেলিয়া, ওয়াটার স্ট্রাইডার, ওয়াটার বোটম্যান, বিভিন্ন জাতের মাকড়সা যথা নেকড়ে মাকড়সা, লিনক্স, লম্বামুখী ও অর্ব মাকড়সা মাজরা পোকার কীড়া খায়। প্রেয়িং মেনটিড, পাখি, মাছ, ব্যাঙ, ড্যামসেল ফ্লাই এসব প্রাণীরা মাজরা পোকার মথ খেয়ে থাকে। তাছাড়া কিছু পরজীবী পোকা রয়েছে যথা ট্রাইকোগ্রামা, টেলিনোমাস, টেট্রাসটিকাস, ট্রাইকোমেলপসিস বোলতা, টেলিমুচা, জ্যান্থপিম্পলা, কোটেসিয়া বোলতা ও ইলামাস এসব মাজরা পোকার ডিম, কীড়া ও মুককীটের পরজীবী হিসেবে কাজ করে।
আপনার ধান ক্ষেতে কুশি অবস্থায় যদি ১০ থেকে ১৫% কুশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে মরাডিগ এবং থোড়ের পর থেকে শিষ বের হওয়া পর্যন্ত সময়ে ৫% কুশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় কেবলমাত্র তখনি কীটনাশক ব্যবহার করতে পারেন। কীটনাশক হিসেবে কার্বোফুরান, এসিফেট, কার্বোসালফান, কারটাপ। তাছাড়া থায়ামেথোস্কেম ও ক্লোরানিলিপ্রল জাতীয় কীটনাশক পরিমিত মাত্রায়, সঠিক সময়ে এবং সঠিক নিয়মে ব্যবহার করতে হবে।
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ…
- Advertisement -