- Advertisement -

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু ও কৃষি

1,673

- Advertisement -

 

কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কৃষি ও কৃষক বান্ধব। সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, উন্নত বাংলাদেশ এবং সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ পূনর্গঠন করতে গিয়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সার্বিক উন্নয়নে কৃষির উন্নতির কোন বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল তার অন্যতম প্রয়াস। তিনি জানতেন, মানুষের প্রথম চাহিদা খাদ্য। তাই খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে তিনি কৃষি এবং কৃষকের উন্নয়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষির উন্নয়ন বলতে বুঝায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন। তিনি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত এ জনপদটিকে কৃষি অর্থনীতিতে স্বনির্ভর করে তোলার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচী গ্রহণ করেন। দূরদর্শী ও বিচক্ষণ বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, কৃষি ও কৃষকের উন্নতি বিধান নিশ্চিত করা না গেলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন কৃষি বিপ্লবের। সমবায়ের মাধ্যমে তিনি কৃষি বিপ্লবকে সফল করতে চেয়েছিলেন। কৃষি বিপ্লব ও সবুজ বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য তিনি উচ্চতর কৃষি শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং সম্প্রসারণের দিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন। স্বগৌরবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু দেশকে পেয়েছিলেন ধ্বংস স্তুপ হিসেবে। এই ধ্বংসস্তুপ হতে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি দ্বিতীয় বিপ্লবে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু লৌহমানবের ন্যায় দেশকে দ্বিতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য ঝাপিয়ে পড়েন। সুকৌশলী রাজনৈতিক পরিকল্পনায় দেশকে বিশ^সারির উন্নত দেশ গড়ার দিকে ধাবিত করেন। মাত্র সাড়ে ৩ বছরে তার যোগ্য নেতৃত্বের প্রতিফলনস্বরূপ এদেশে আর্থ সামাজিক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছিল। দুর্যোগের ঘনঘটা থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান দেখে বিশে^র অনেক দেশই বাহবা দিয়েছে। বাড়িয়ে দিয়েছে সহযোগিতার হাত। বঙ্গবন্ধুর জাতীয় ও বৈদশিক নীতির জন্য তিনি বিশ^জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তার প্রেক্ষিতগুলো ছিল-

১.  বঙ্গবন্ধু কৃষকদের ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। এ কারণে কৃষিকার্যে জড়িত কৃষককুল উপকৃত ও উৎসাহিত হয়েছে। খাজনা দেয়ার অক্ষমতা ও জটিলতা হতে মুক্ত হয়ে কৃষকরা স্বস্তিতে মনের আনন্দে কাজ করে গেছেন।  খাজনার দায় থেকে সহজেই মুক্ত হয়ে নিজেরা সমৃদ্ধ হয়েছিলেন।

২. অর্থনৈতিক উন্নতির অন্যতম মূল উপায় সম্পদের সুষম বন্টন। বঙ্গবন্ধু সম্পদের সুষম বন্টনে উৎসাহিত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু একই ব্যক্তির নামে ১০০ বিঘার উপরে জমি থাকাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। অতিরিক্ত জমি ভূমিহীনদের মাঝে বন্টন করেন। ভূমিহীনদের চাষাবাদ করার সুযোগ তৈরি করে দেন। এভাবে কৃষি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছেন। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে নিরুৎসাহিত করেছেন।

৩. গ্রাম্য সমাজভিত্তিক গরীব কৃষকদের সহযোগিতার জন্য সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করেছিলেন।

৪. স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রায় ২২ লাখের বেশি কৃষক পরিবারকে পুনর্বাসন করেছিলেন।

৫.  দেশের খাদ্য ও জ্বালানি চাহিদা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুই প্রথমে বৃক্ষরোপণ অভিযান শুরু করেছিলেন। কাঠ ও কাগজ শিল্পে আমদানি নির্ভরতা পরিহার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বৃক্ষরোপণ করে তার দেশের চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানি করায় উৎসাহিত করেন।

৬. কৃষি কৃষকদের উন্নয়নে তিনিই প্রথম বাজেটে কৃষি খাতে ভর্তুকির ব্যবস্থা করেন। বাজেটে ভর্তুকি দিয়ে বিনামূল্যে কীটনাশক, সার ও সেচ যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেন। ফলে কৃষি উৎপাদন অতীতের যে কোন সময় থেকে অনেক বেশি উৎপাদিত হয়েছিল।
ক্স তিনি ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি কর্মী নিয়োগ করেছিলেন।

৭.  কৃষি পণ্য বিশেষ করে ধান, পাট, তামাক ও আখের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রাইস সাপোর্ট বা নূন্যতম মূল্য বেধে দিয়েছিলেন। গরীব কৃষকদের রেশনের ব্যবস্থা করেছিলেন।সবুজ বিপ্লব কর্মসূচির আওতায় অনাবাদি জমির আবাদ ও খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি গ্রামভিত্তিক সবুজ বিপ্লব কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

৮.  ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের বাজেটে কৃষিখাতে সর্ব্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন।

গ্রাম বাংলার মাটি মানুষের সন্তান ছিলেন তিনি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলার মাটি সোনার চেয়ে খাটি। তাইতো বারবার বিদেশ থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ও শোষককে টেনে এনেছে এই বাংলার মাটি। বাংলাদেশের মাটি যদি সোনার মাটি না হতো তাহলে এতোদিন আমাদের পরাধীন থাকতে হতো না। তিনি আরোও বলেন, বাংলার মাটির মত মাটি দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই মাটিতে সোনালী ফসল ফলিয়েই সোনার বাংলা তৈরি করা সম্ভব। কৃষি ও কৃষকদের প্রতি ছিল গভীর টান ও মমত্ববোধ। তাইতো কৃষিবিদদের কৃষকদের দোড়গোড়ায় চলে যেতে বলেন। পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে বলেন। উৎপাদন আরোও বাড়াতে বলেন। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সহায়তার কথা বলেন।

কৃষি বিপ্লবের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে। কৃষকদের রক্ষা করতে হবে। ফ্রাগমেন্টেশন অব ল্যান্ড দেশে আছে, সে কারণে কালেকটিভ ফার্ম-এর দিকে যদি না যাই তবে অধিক শস্য উৎপাদন সম্ভব হবে না। সেজন্য মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়া চলবে না। সমবায় ভিত্তিতে কাজ করে দেখাতে হবে। শহরমুখো রাজনীতির কথা ভুলে যেতে বলেছিলেন। তিনি বলেন, আমরা এখন গ্রামের দিকে যাচ্ছি। তখন আপনাদের দাম অনেক বেড়ে যাবে। শহরের ভদ্রলোকদের দেখে আপনাদের চিন্তার কোন কারণ নাই। কারণ গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে যেতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে হবে। উৎপাদন করতে হবে। তা না হলে বাংলাকে বাঁচাতে পারবেন না।

জাতির পিতা কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানে কৃষি বিপ্লবের লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, জনগনের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংবিধানের আলোকে জাতির পিতা কৃষি খাতের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের কাজে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য সে কাজ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরে ও কৃষি তথা ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় কোন সঠিক দিক নির্দেশনা বা নীতিমালা ছিল না। তাই স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও নির্দিষ্ট নীতিমালা না থকায় কৃষিখাতের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বারবার ব্যাহত হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতি নির্ভর দেশ। কৃষি এবং কৃষকরাই বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে কৃষকরাও ছিলেন সামনের সারিতে। সম্মুখ সমরে অংশগ্রহনের পাশাপাশি নানাভাবে তারা মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধে কৃষকদের অবদান অনস্বীকার্য। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, কৃষি চেতনা, কৃষক ও কৃষির সাথে তার গভীর নিবিষ্টতার ফসল হলো তারই সূচীত কৃষি উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আজকের সুজলা, সুফলা,শস্য শ্যামলা সোনার বাংলা।

বঙ্গবন্ধুর সূদুরপ্রসারী চিন্তা, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে তার গৃহীত পদক্ষেপ আজ আমাদের কাছে অনুসরণীয়। বঙ্গবন্ধুর কৃষিতে যুগান্তকারী উদ্যোগগুলো ছিল কৃষি বিপ্লব, সবুজ বিপ্লব, খালকাটা, সমবায় কর্মসূচী। এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের ফলে আজ বাংলাদেশ খাদ্যশস্যে স্বয়ংসর্র্ম্পূণ। বর্তমানে বিদেশে চাল রপ্তানি করছে। সবজি উৎপাদনে বিশ্বে ৩য়, চাল উৎপাদনে ৪র্থ, মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, ছাগল উৎপাদনে বিশ্বে ৪র্থ । প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনেও বিরাট সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমাদের আরোও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, ধ্যান ধারনা ও আরাধনার ধন সোনার বাংলা। যা লুকিয়ে আছে চির অবহেলিত গ্রামের আনাচে কানাচে, চির উপেক্ষিত পল্লীর কন্দরে, বিস্তীর্ণ জলাভূমির আশেপাশে আর সুবিশাল অরণ্যের গভীরে। চলুন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুপ্ত সোনার বাংলাকে জাগিয়ে তুলি।

 

- Advertisement -

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.