- Advertisement -
হাওর এলাকায় বোরো মওসুমে ধান চাষ
কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
হাওরাঞ্চলে মানুষের যক্ষ্মের ধন বোরো ধান। কথায় আছে, এক ফসলি ধান; হাওরবাসীর প্রাণ। বাংলাদেশে প্রায় ৩৭৩টি হাওরের মোট আয়তন ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬০ হেক্টর। যেখানে প্রায় ০.৭৩ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়ে থাকে। উৎপাদনের পরিমাণ নেহায়েৎ কম নয়, তা প্রায় তিন (০৩) লাখ মেট্রিক টন ধান। কিন্তু হাওরে বোরো ফসল উৎপাদন একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার। হাওর থেকে সময়মতো পানি না নামা, শ্রমিকের অপ্রতুলতা, অসময়ে বৃষ্টি, বীজতলা তৈরিতে সমস্যা, শৈত্যপ্রবাহ, অতিরিক্ত গরম, যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, রোগ ও পোকামাকড়ের প্রার্দুভাব সর্বোপরি পাহাড়ী ঢল তথা আগাম বন্যা বোরো ফসলকে সময়ে সময়ে বিপদে ফেলে, কষ্ট দেয়, বিব্রত করে এমনকি নি:শেষ করে দেয়। ফলে কৃষক চুড়ান্তভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। হাওরে বোরো ফসল উৎপাদন প্রকৃতির খেয়াল মর্জির ওপর নির্ভরশীল তারপরও কিছু পরিকল্পিত উদ্যোগ কৃষকদের আশার সঞ্চার তৈরি করতে পারে। প্রকৃতির বিরুপ খেয়াল আচরণকে আমাদের সীমিত সম্পদ, প্রযুক্তি আর দৃঢ় মনোবলের পুঁজি নিয়ে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করেই আমরা সফলকাম হতে পারি।
সঠিক জাত এবং বীজতলা তৈরির সঠিক সময় নির্ধারণ করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জমির অবস্থান, উর্বরতা ও পাহাড়ি ঢল নামার সময় বুঝে উপযুক্ত ধানের জাত নির্বাচন করতে হবে। হাওর অঞ্চলে স্বল্প জীবনকালীন ধানের জাত ব্যবহার করা অতি উত্তম। তবে হাওরের কান্দা বা উঁচু জায়গা বা স্কিমের জমিতে ব্রি ধান৫৮, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৬৯, তাছাড়া বিনাধান১৪ এসব দীর্ঘ জীবনকালীন (১৫০ দিন বা বেশি) জাত আবাদ করতে পারেন। হাওরের তলানি বা নিচের দিকে অবশ্যই স্বল্প জীবনকালীন জাত (১৪০-১৪৫ দিন) যেমন ব্রি ধান২৮, বিনাধান ১০, ব্রি ধান৩৫, ব্রি ধান৩৬, ব্রি ধান৪৫, ব্রি ধান৭৪, ব্রি হাইব্রিড ধান ৩ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান ৫ চাষাবাদ করতে পারেন। তবে হাওরের একেবারে তলানিতে উফশী বোরো ধান আবাদ না করাই শ্রেয়।
বোরো ধানের প্রজনন পর্যায়ে শৈত্যপ্রবাহ কিংবা অতিরিক্ত গরম, তাছাড়া আগাম পাহাড়ী ঢল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দীর্ঘ জীবনকালীন জাত যেমন ব্রি ধান২৯ অবশ্যই নভেম্বর মাসের ০১ থেকে ০৭ তারিখের (১৭-২৩ কার্তিক) মধ্যে বীজতলা সম্পন্ন করে, ৩৫-৪৫ দিন বয়সী চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। আবার কম জীবনকালীন জাতের জন্য যেমন ব্রি ধান২৮ অবশ্যই ১৫ নভেম্বর থেকে ২২ নভেম্বরের (অগ্রহায়নের প্রথম সপ্তাহ) মধ্যে বীজতলা সম্পন্ন করে ৩০-৩৫ দিন বয়সী চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। গবেষণা থেকে জানা গেছে, ধানের প্রজনন পর্যায়ে পড় তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর নিচে পাঁচ দিনের অধিক সময় বিরাজ করলে ধানের অতিরিক্ত চিটা হওয়ার আশঙ্কা থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় হাওর এলাকায় বৈশাখের তৃতীয় সপ্তাহে (এপ্রিলের শেষ/মে মাসের শুরু) পাহাড়ি ঢলে বন্যা আসে। বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ (১৪-২০ এপ্রিল) ধান পাকলে একদিকে যেমন চিটা হবে না, অন্যদিকে ধান তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে যাবে। তাইতো সঠিক সময়ে সঠিক জাতের এবং সঠিক বয়সের ধানের চারা রোপণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ভালো বীজে ভাল ফসল। তাই ভালো বীজ সংগ্রহ করে, শুরুতেই ছত্রাকনাশক কার্বেন্ডাজিম (০.৩%) দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে, এর ফলে জমিতে বাকানি রোগের প্রার্দুভাব কমে যাবে। বীজতলা তৈরিতে অবশ্যই আদর্শ বীজতলা প্রস্তুত করতে হবে। বীজতলায় প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ৫০ গ্রাম বীজ ব্যবহার উত্তম, এতে হালিচারা গুলোতে বীজতলাতেই কমপক্ষে তিনটা কুশি গজায়, যা পরবর্তীতে ফলন বাড়াতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বীজতলায় প্রতি বর্গমিটার জমির জন্য ০৭ গ্রাম এমওপি ও ০৭ গ্রাম টিএসপি সার ব্যবহার করলে হালিচারার গুণগতমান বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া শৈত্য প্রবাহ থেকে রক্ষার জন্য বীজ তলায় ৩-৫ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখা উচিত পাশাপাশি সূর্যোদয়ের ২-৪ ঘন্টা পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্বচ্ছ পলিথিনের ছাউনি দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখা উচিত।
বোরো ধানের চারা রোপণের সময় কম জীবনকালীন জাত যেমন ব্রি ধান২৮ (১৫০ দিন বা তার চেয়ে কম জীবনকালের) ধানের জাতের ক্ষেত্রে ৩০-৩৫ দিনের চারা রোপন করতে হবে। দীর্ঘ জীবনকালীন জাত যেমন ব্রি ধান২৯ (১৫০ দিনের বেশি) জাতের ক্ষেত্রে ৩৫-৪৫ দিনের চারা রোপন করতে হবে। বাদামী গাছ ফড়িংয়ের আক্রমনপ্রবণ এলাকায় ২৫ সেমি ১৫ সেমি ব্যবধানে এবং লোগো পদ্ধতিতে (৮-১০ সারি পর পর সারি ফাঁকা রাখা) রোপন করা উত্তম। চারা রোপনের সময় জমির উর্বরতা অনুযায়ী সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করতে হবে। কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, বোরো ধানের জমিতে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগের সময় ১ম কিস্তিতে মোট সারের ৫০ ভাগ, ২য় কিস্তিতে ৩০ ভাগ এবং ৩য় কিস্তিতে ২০ ভাগ হারে প্রয়োগ করলে ধান গাছের জন্য খুব ভালো হয়, কারণ সক্রিয় কুশির সংখ্যা বেড়ে যায় ফলে ফলন বাড়ে। তাছাড়া এমওপি ব্যবহারের ক্ষেত্রে মোট পরিমাণের ৮০ ভাগ জমি তৈরির সময় এবং বাকি ২০ ভাগ উপরি প্রয়োগ করলে বালাইয়ের আক্রমন কম হয়। হাওরে ফসলি মাটি পানির নিচে থাকে বিধায় সালফারের ঘাটতি হয়ে থাকে, তাই সালফার জাতীয় সার অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া হাওরে জিংক সারের অভাব লক্ষ্য করা যায় তাই জিংক সার ১% হারে স্প্রে করা যেতে পারে। চারা রোপনের পর শৈত্য প্রবাহ হলে মাঠে ১০-১৫ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে হবে।
ধানের বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে বিরাজমান তাপমাত্রা ও পাহাড়ি ঢল, রোগবালাই ও পোকামাকড়সহ বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি ঝুঁকিমুক্ত রেখে চাষাবাদ ও নিরাপদ ফসল সংগ্রহ করার জন্য সকল জমিতে এক জাতের ধানের চাষ না করে স্বল্প জীবনকালীন বিভিন্ন জাতের ধান চাষাবাদ করা উচিত। একজন কৃষকের পরম আবেদিত ইচ্ছা, হাওর অঞ্চলের জন্য এমন জাত দরকার যা স্বল্প জীবনকাল, উচ্চ ফলনশীল, ঠান্ডা ও খরা সহনশীল, হেলে ও ঝরে পড়ে না। ধান বিজ্ঞানীরা নিষ্ঠার সাথে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে উক্ত কৃষকের মনের বাসনা পূরণের জন্য। নেপোলিয়নের কথা ধরে শেষ করতে চাই, অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কিছু নাই। হাওর অঞ্চলের জন্য কমপ্লিট প্যাকেজের একটি জাত অবশ্যই আসবে, তা সময়ের ব্যাপার মাত্র। (তথ্যসূত্র: ২২/১০/২০১৭ খ্রি. তারিখে ব্রি কর্তৃক আয়োজিত “হাওড় অঞ্চলে নির্বিঘ্নে বোরো ধান চাষ বিষয়ক কর্মশালায়” থেকে সংগৃহীত তথ্যাদির সারসংক্ষেপ)
- Advertisement -
মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.