- Advertisement -

সাম্প্রতিক বন্যা পরবর্তী ফসল উৎপাদন ও পরিচর্যার কৌশল

বন্যা পরবর্তী ফসল উৎপাদন ও পরিচর্যার কৌশল

367

- Advertisement -

সাম্প্রতিক বন্যা পরবর্তী ফসল উৎপাদন ও পরিচর্যার কৌশল

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়াগত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ আবহমান কাল থেকেই আবর্তিত হয়ে আসছে বাংলাদেশে। দক্ষিণে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগর, উত্তরে প্রসারিত হিমালয়ের পূর্বপ্রান্ত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আসাম, মেঘালয়ের পাহাড় ও দক্ষিণ-পূর্বে সুদৃঢ় আরাকান পাহাড় ও পাহাড়ী বনাঞ্চল। মৌসুমি বায়ু প্রভাবিত বাংলাদেশের আবহাওয়া যেমন অনুকূলে তেমনি চরম প্রতিকূলতাও রয়েছে। প্রায় প্রতি বছর কোন না কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দেয় সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা বাংলার বুকে। বন্যা বাংলাদেশের একটি নিয়মিত ভয়াবহ দুর্যোগের নাম। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা সংগঠিত হয়। বন্যার ভয়াল থাবায় কখনও কখনও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। ভাসিয়ে নিয়ে যায় জনপদ, শহর-বন্দর, হাট-বাজার ও ফসলের মাঠ। বিনষ্ট হয় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট; ক্ষতিগ্রস্থ হয় মানুষ ও গবাদিপশুরর জীবন। ক্ষতির সম্মুখীন হয় কোটি কোটি টাকার সম্পদ। অর্থনীতির সমৃদ্ধির চাকাও মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়ায়। সিলেট অঞ্চল একটি বন্যা কবলিত লাল তালিকাভূক্ত এলাকা। ভৌগোলিক অবস্থানই এই এলাকায় বন্যা সংগঠিত হওয়ার অন্যতম কারণ। মূলত উজান থেকে, বিশেষ করে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের পাহাড় থেকে ভেসে আসা ঢলের পানি, পলি জমে নদী ও নদীর মোহনা ভরাট হয়ে যাওয়া, নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট, হাট বাজার, ব্রিজ-কালবার্ট, বাঁধ বন্যা সংঘঠিত হওয়ার অন্যতম কারণ। প্রতি বছরই আগাম বন্যা, আকস্মিক বন্যা বা স্বাভাবিক বন্যার করাল ঘাতে বিধ্বস্ত হয় সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা। সমসাময়িক বন্যা এই অঞ্চলের জনজীবনের সাথে একসাথে মিশে গেলেও প্রতি বছর কৃষিখাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বন্যার মত প্রাকৃতিক এই ভয়াল দুর্যোগ প্রতিরোধ করে ফসলের মাঠকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও ফসল উৎপাদন কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।

রোপা আমন ধান আবাদে করণীয়
বর্তমানে মাঠে দন্ডায়মান আবাদকৃত রোপা আমন ধানের জমিতে বন্যার পানি সরে যাওয়া পর কয়েক দিন হাঁটা চলা করা যাবে না। ধান গাছের পাতায় পলি জমে থাকলে বাঁশ, রশি বা দড়ি দিয়ে টেনে দিতে হবে, সম্ভব হলে পানি স্প্রে করতে হবে যেন গাছের পাতায় লেগে থাকা পলি পড়ে যায়। বৃষ্টি বা বাতাসেও পলি ঝরে যেতে পারে। পানি সরে যাওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন পর জমিতে বিঘা প্রতি ৫ থেকে ৭ কেজি ইউরিয়া সার এবং ৫ কেজি হারে এমওপি সার দিয়ে দিতে হবে। ফলে ধানগাছ তার সাময়িক ক্ষতি পুশিয়ে নিতে পারবে এবং গাছের বাড় বাড়তি ভাল হবে। সুস্থ গুছি থেকে কিছু চারা তুলে নিয়ে ফাঁকা জায়গা পূরণ করে দিতে হবে। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পরপরই ধান গাছের পাতার ৮-১০ সেমি (৩-৪ ইঞ্চি) আগা কেটে দিতে হবে এবং ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে উঁচু জায়গায় নতুন করে নাবি জাতের ধানের বীজতলা করতে হবে। এক্ষেত্রে নাবি জাত বিআর ২২, বিআর ২৩, ব্রি ধান ৪৬, বিনাশাইল ধানের জাত ব্যবহার করতে পারেন। তাছাড়া কিছু স্থানীয় জাত নাইজার শাইল, বিরইন জাত ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখের পর ধানের চারা রোপণ করা উচিত হবে না। নাবি রোপণের বেলায় ৫০-৬০ দিনের চারা প্রতি গুছিতে ৭/৮টি করে আশ্বিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘন করে রোপণ করতে হবে। দাপোগ পদ্ধতির পাশাপাশি বাড়ির আঙিনায় অথবা কলার ভেলা, বাঁশের মাচায় চাটাই বিছিয়ে ঘন করে বীজতলা করা যায়। দাপোগ পদ্ধতির বীজতলায় উৎপাদিত চারা ১৫ দিনের মধ্যেই রোপণ করা যাবে। এভাবে রোপা আমন ধানের উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।

শাকসবজি
জমি থেকে বন্যার পানি নেমে যাবার সাথে সাথে পাতাজাতীয় সবজি যেমন- লালশাক, পালংশাক, ডাটা, গীমাকলমি এসব সবজির চাষ করা যাবে। আগাম শীতকালীন সবজির আবাদ করতে হলে বাড়ির আঙিনায় বা উঁচু জায়গায় শাকসবজির চারা উৎপাদন করতে হবে। তবে শুকনো জায়গার অভাব হলে টব, মাটির চাড়ি, কাটা ড্রাম, কাঠের বাক্স বা পুরানো টিনে মাটি দিয়ে তার সাথে জৈব সার মিশিয়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন প্রকার শীতকালীন সবজি বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করতে হবে। আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ শাকসবজি, ফল ও অন্যান্য ফসলী জমির রস কমানোর জন্য মাটি আলগা করে ছাই মিশিয়ে এবং সামান্য ইউরিয়া ও পটাশ সার প্রয়োগ করতে হবে। কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষিত বিভিন্ন বীজ রোদে শুকিয়ে ছায়ায় ঠান্ডা করে পুনরায় সংরক্ষণ করতে হবে। ইতোমধ্যে লাগানো শিম, লাউ বা অন্যান্য সবজি চারার গোড়ায় পানি এলে চারাগুলো মাটির পাত্রে বা কলাগাছের খোলে ভাসিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যেন পানি সরে গেলে আবার মাটিতে লাগানো যায়। বসতবাড়ির আঙিনায় সামান্যতম জমি খালি না রেখে উঁচু জায়গায় বা মাঁচা করে সবজির চারা উৎপাদন করতে হবে। বন্যার পানি সরে গেলে উপযুক্ত স্থানে রোপণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাছাড়া বন্যার পানি নেমে গেলে ভেজা মাটিতে মাসকলাই, খেসারি, ভুট্টা বীজ বুনে দেওয়া যাবে। পরে একই জমিতে অন্যান্য রবি ফসলের আবাদ করা যাবে। এছাড়া যেসব জমিতে আমন ধান রোপণ করা সম্ভব হয়নি সেসব জমিতে ভূট্টার বীজ বোনা হলে খুবই ভালো ফলন পাওয়া যাবে। বন্যার পানি সরে গেলে ‘জো’ আসার পর বিনা চাষে ভুট্টা ও সরিষার বীজ এবং আলু, চীনাবাদাম, রসুন বুনা যাবে। জমি থেকে পানি নেমে যাবার পরপরই জমির সার্বিক অবস্থা বুঝে একই জমিতে মাসকলাই, খেসারী বা মুগকলাই রিলে ফসল হিসেবে বপন করা যাবে। মাটির উর্বরতার পাশাপাশি বোরো আবাদের আগেই ডাল ফসলের একটি বাড়তি ফসল পাওয়া যায়। আবার আন্তঃফসল হিসেবে রবি মৌসুমে চাষাবাদ করেও বন্যার ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। রবি মৌসুমে যেসব জমিতে সারি করে ভূট্টার আবাদ করা হয় সেসব জমিতে ভূট্টা ফসলের দু’সারির মাঝে আন্তঃফসল হিসেবে মাসকলাই বা মুগকলাই চাষ করা আরও একটি লাভজনক ফসল।

গম
বন্যা বা বর্ষার পানি জমি থেকে নেমে যাবার পর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গম বীজ বপন করতে হবে। সাধারণত নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত বীজ বপন করা হলে গমের সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যেতে পারে। বৃষ্টি বা সেচের পানি সহজে নিষ্কাশিত হয়, দো-আঁশ মাটি সমৃদ্ধ এমন জমি গমবীজ বপনের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নভেম্বর মাসের তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহ জমিতে গমবীজ বপনের উপযুক্ত সময় । সময়মতো জমিতে গমবীজ বপন করা আবশ্যক। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট (বারি) অনেকগুলো উচ্চফলনশীল জাতের গমবীজ উদ্ভাবন করেছে। সিলেট অঞ্চলে বারি গম ২৫, বারি গম ২৬ চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী।

বোরো ধান
বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য বা রোপা আমনের আবাদ ভালো না হলে জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা জরুরি। এক্ষেত্রে আগাম প্রস্তুতিমূলক কিছু কৌশল অনুসরণ করতে হবে। সিলেট অঞ্চল তথা সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকাসহ সকল এলাকার জন্য ধানে যেন চিটা না হয় তার সাবধানতা আগে ভাগেই নেওয়া উচিত। ধান চিটা হওয়া থেকে রক্ষা করতে বীজতলা ব্রিধান-২৮ এর ক্ষেত্রে ১৫-৩০ নভেম্বরের মধ্যে এবং ব্রিধান-২৯ এর ক্ষেত্রে ৫-২৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজতলা সম্পন্ন করার উৎকৃষ্ট সময়। কাইচথোড় আসার সময় যদি দিনের তাপমাত্রা ১৭-১৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এবং রাতের তাপমাত্রা ১২-১৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড এর নিচে থাকে, তবে ধান চিটা হবেই। কাইচ থোড়কে ঠান্ডা জনিত আঘাতের সময়টিকে পাস কাটানো বা রক্ষা করতে হলে নিয়ম মোতাবেক বীজতলা তৈরি করতে হবে। সাধারণত নভেম্বর মাসের শেষ ও ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে বোরো ধানের বীজতলা তৈরী করার উপযোগী সময়। সঠিক বয়সের চারা রোপণ তথা বোরো ধানের জন্য ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের চারা রোপণ করা উত্তম। বোরো ধান আবাদের জন্য কৃষকভাইদের দলবদ্ধভাবে কমিউনিটি বীজতলার মাধ্যমে বোরো ধানের উপযুক্ত জাতের চারা উৎপাদন করা প্রয়োজন। একত্রে উৎপাদিত চারা পরে কৃষকভাইয়েরা সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নিজেদের জমিতে রোপণ করতে পারবেন। গুণগতমানের উচ্চফলনশীল জাতের পাশাপাশি বোরো ধানের আশানুরূপ ফলন পেতে হলে জৈব সারসহ সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করা, পরিমিত হারে এবং সময়মত জমিতে সেচ দেয়া, জমিতে সঠিক সময়ে চারা রোপণ এবং জমির আগাছা দমন করা, আইপিএম পদ্ধতিতে জমির পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন করা, এছাড়াও জমিতে অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তিসমূহ ব্যবহার করতে হবে।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বিগত ৫০ বছরে প্রায় ১৭ টি ভয়াবহ বন্যা দেশব্যাপী সংঘটিত হয়েছে। তন্মধ্যে ১৯৫৪, ১৯৫৫, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০০ সালের বন্যা উল্লেখযোগ্য। মহা প্রলয়ংকারী ১৯৮৮ সালের বন্যা সংঘঠিত হলেও ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, যার স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ৭২ দিন। এক রিপোর্টে জানা যায়, দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা প্লাবিত এই বন্যায় কৃষি খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। বিনষ্ট হয় প্রায় সাত হাজার কিলোমিটার রাস্তাঘাট এবং জনজীবন নি:শেষ হয় প্রায় ১০৮৫ জন । সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা।

বন্যা আমাদের স্বাভাবিক কৃষি কাজ ও অগ্রগতিকে লন্ডভন্ড করে দেয়। বন্যা পরবর্তী ফসল উৎপাদন কৌশলগুলো যতেœর সাথে মেধা বু্িদ্ধ দিয়ে ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারলে বন্যার ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে, প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.