- Advertisement -

সম্ভাবনাময় শিল্প আগর-আতর সমাচার

বাংলাদেশের তরল সোনা

1,291

- Advertisement -

সম্ভাবনাময় শিল্প আগর-আতর সমাচার

পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। সুরভিত সুগন্ধির সুঘ্রাণ যেকোনো অনুষ্ঠানে আনে পবিত্রতার আমেজ। অনাদিকাল থেকেই বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষ বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি দ্রব্য ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহার করে আসছে। রিফ্রেশমেন্ট বা সতেজতার এই আধুনিক যুগে পৃথিবী ব্যাপী এসব সুগন্ধি দ্রব্যের চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে শিল্প কারখানায় রাসায়নিক সংমিশ্রণের মাধ্যমে সুগন্ধি তৈরি হয়ে থাকে। তবে এখনও কিছু কিছু প্রাকৃতিক বা ভেষজ সুগন্ধি দেশে বিদেশে দারুনভাবে জনপ্রিয়। পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সুগন্ধির উৎসগুলোর মধ্যে আগর আতর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত। আগর অতি প্রাচীনতম গ্রামীন হস্ত ও কুটির শিল্প পণ্য। বাংলাদেশের তরল সোনা নামে খ্যাত একটি ভেষজ সুগন্ধি আগর-আতর। আগর গাছ থেকে এসব আতর উৎপাদিত হয়। সুদীর্ঘকাল থেকে বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ি এবং পাবর্ত্য চট্রগ্রাম এলাকার কিছু অংশে আগর গাছ উৎপাদন হয়ে আসছে। আগর কাঠ থেকে সনাতন পদ্ধতিতে ঘরোয়াভাবে বিশেষ পাতন প্রক্রিয়ায় আতর তৈরি করা হয়। ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের পণ্য এই আতর মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় ফলে অর্জিত হয় বৈদেশিক মুদ্রা। আগর বাংলাদেশের অর্থনীতির এক সম্ভাবনাময় সুপ্ত শিল্প হলো শিল্প।

আগর গাছের পরিচিতি

আগর মূলত একটি গাছের নাম। আগর শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো উৎকৃষ্ট বা সুগন্ধি বিশিষ্ট কাঠ। ইংরেজিতে এর নাম এলো ওড, আরবিতে বলে উদ, দক্ষিণ এশিয়ায় পরিচিত নাম গাডর উদ, মালয়েশিয়ান ভাষায় গাহারু, হারবাল ইউনানী চিকিৎসায় এর নাম উদহিন্দ এবং আয়ুর্বেদিক ভাষায় অগুরু বলে পরিচিত ও সমাদৃত। বাংলা, আরবি এবং ফারসিসহ বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে অপভ্রংশ হয়ে আগর নামটির উৎপত্তি হয়েছে। পৃথিবীতে কবে কোথায় আগর-আতরের চাষাবাদ শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস বের করা মুশকিল। তবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রেইন ফরেস্টই আগর গাছের আদিস্থান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। আগর গাছ থেকে বিশেষ কালো রঙের কাঠ পাওয়া যায়, যা আগর কাঠ নামে পরিচিত স্থানীয় ভাষায় যা “মাল” বলে অভিহিত করা হয়। স্থানীয় ভাবে যারা আগর কাঠ সনাক্ত করেন তাদের “দৌড়াল” বলা হয়ে থাকে।

আগর গাছ একটি বহু বর্ষজীবি চিরসবুজ উদ্ভিদ। এই গাছ খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। Aquilaria গণের প্রায় ১৫ টি প্রজাতির গাছ থেকে আগর কাঠ সংগ্রহ করা যায়। বাংলাদেশে মূলত Aquilaria agallucha এবং Aquilaria malaccenesis প্রজাতির আগর গাছ চাষ হয়ে থাকে। ট্যাক্সোনোমিকেলি আগর গাছ Thymelaeaceae পরিবারের অন্তর্গত। আগর গাছ লম্বায় প্রায় ১৫ থেকে ৪০ মিটার এবং বেড় বা ব্যাস ০.৬-২.৫ মিটার হয়ে থাকে। শাখা প্রশাখবিহীন সোজা লম্বা গাছটি দেখতে এবং আকার আকৃতিতে অনেকটা শাল বা গজারি গাছের মতো। এ গাছে সাদা রঙ্গের ফুল এবং ফলগুলো ক্যাপসুল আকৃতির হয়। আগর গাছের পাতা দেখতে অনেকটা লিচু গাছের পাতার মতো, অনেকে বকুল গাছের পাতার সাথেও মিলাতে পারেন। পাতা চিকন এবং ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা, পাতার রং সবুজ। সাদা রংয়ের আগর কাঠ খুব নরম হয়। ফলে আতর উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহ ও জ্বালানী কাঠ ছাড়া অন্য কোন কাজে এ গাছ ব্যবহার হয় না। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রেইন ফরেস্টে আগর গাছের সন্ধান পাওয়া গেলেও বর্তমানে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশে আগর গাছ চাষ হয়ে থাকে।

সুজানগরের আগর গাছের পূর্বের কথা

মধ্যপ্রাচ্য, চীন ও জাপানে আগর কাঠের আতর বা সুগন্ধি ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় ৩০০০ বছরের। বিভিন্ন সন্ন্যাসীদের আশ্রমে ধ্যানের সময় সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য আগর কাঠ পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হত। বিখ্যাত পর্যটক ছয়রাফি ও ইবনে বতুতার পর্যটন কাহিনী এবং সম্রাট জাহাঙ্গীররের শাসনামলে বাংলা ও আসামের কর্তৃত্বাধীন সেনাপতি মির্জা নাথানের স্মৃতিকথায় বড়লেখার সুজানগরের আগর আতরের গল্প জানা যায়। তাছাড়া পাথারিয়া পাহাড়েও (জলপ্রপাত মাধবকুন্ড সংলগ্ন পাহাড়) আগর গাছ প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে বড়লেখা অঞ্চলে আগর কাঠ ও আতর উৎপন্ন হত বলে সংস্কৃত ভাষায় রচিত “হর্ষচরিত” গ্রন্থে উল্লেখ আছে। এক সময় সিলেট অঞ্চলের মৌলভীবাজার জেলাধীন বড়লেখা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম সুজানগরে আবিষ্কৃত হয় পাহাড়ের এক ধরনের গাছ থেকে বাষ্পায়ন পদ্ধতিতে সুগন্ধি আতর তৈরী । ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সুজানগর গ্রামে আগর গাছের অস্তিৃত্ব সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয় (সরেজমিন অভিজ্ঞতায় জানা যায়, এখনকার আগর চাষিদের পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ এভাবে ৫ থেকে ৬ ছয় পুরুষের ক্রমধারা তারা বানিজ্যিকভাবে আগর আতর উৎপাদনের সাথে কাজ করত)। তখন থেকেই আগর আতর দিয়ে সুজানগর গ্রামের মানুষের ভাগ্যের চাকা পাল্টাতে থাকে। এ অঞ্চলে মোগল আমল থেকেই আতর শিল্প নিবিড়ভাবে গড়ে উঠেছে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগেও এ অঞ্চলে প্রায় হাজার খানেক আতর শিল্প কারখানা চালু ছিল বলে জানা যায়। হাজার হাজার লোকজন এ কাজে জড়িত ছিল এবং আতর রপ্তানি হত। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় শতশত আগর আতরের কুটির শিল্পকারখানা পাকিস্থানী সৈন্যরা ধ্বংস করে দেয়।

গ্রন্থে আগর

পবিত্র ধর্মগ্রন্থ “বাইবেল”, চীনের বিশ্ব বিখ্যাত পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর ভ্রমণ কাহিনী, বিখ্যাত পর্যটক ছয়রাফি ও ইবনে বতুতার পর্যটন কাহিনী, মোঘল স¤্রাট জাহাঙ্গীরের বাংলা ও আসামের সেনাপতি মির্জা নাথানের স্মৃতিকথা, মহাকবি কালীদাসের “শকুন্তলা”, চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে আগর কাঠের উল্লেখ আছে। এমনকি হযরত শাহজালাল (রাঃ), রাজা গৌরগোবিন্দের রাজ ভান্ডার থেকে মূল্যবান আগর কাঠ ও আতর পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। বিখ্যাত হাদীস শরীফ সহীহ আল বুখারীতেও উল্লেখ আছে যে বেহেশতে আগর কাঠ সুগন্ধি ছড়ায়। সপ্তদশ শতাব্দীতে বড়লেখা অঞ্চলে আগর কাঠ ও আতর উৎপন্ন হত বলে সংস্কৃত ভাষায় রচিত “হর্ষচরিত” গ্রন্থে উল্লেখ আছে। আবুল ফজল আল্লামা ১৫৯০ সনে রচিত আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে আগর কাঠ, আগর তেল ও আগর-আতর আহরণ বিষয়ে বিশদ বর্ণনা করেন।

আগর আতরের ব্যবহার

আগর কনসেপ্টাই ঐতিহাসিক। আগরের নাম শুনলেই রাজা, বাদশাহ, পুরহিত, সন্ন্যাসীদের আভিজাত্যের আমেজের কথা মনের কল্প কাহিণীতে অঙ্কিত হতে থাকে। আগরের ব্যবহার প্রাগৈতিহাসিক। আগর কাঠকে ঈশ্বরের কাঠ বলা হয়। পূর্ব এশিয়া ও জাপানে আগর কাঠ পূজার অর্ঘ্য উপকরণ। মধ্যপ্রাচ্যে আগর কাঠের ব্যবসা ও সমাদর হাজার বছরের পুরনো। জাপানসহ উন্নত দেশ সমূহ আগর সামগ্রি খাদ্যের প্রাকৃতিক রঙ হিসাবে ব্যবহার করছে। আগর-আতর এলকোহলমুক্ত তরল সুগন্ধি দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আগরের সুগন্ধ প্রশান্তিদায়ক, অনেকেই শরীরের শক্তি (বিশেষত যৌনশক্তি) বৃদ্ধিতে সহায়ক হিসেবে কাজে লাগে। নানাবিধ ঔষধ, পারফিউম, পারফিউম জাতীয় দ্রব্যাদি-সাবান, শ্যাম্পু এসব প্রস্তুতে আগর তেল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত: গৃহে, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে সুগন্ধি ছড়ানোর জন্য আগর-আতর ব্যবহার করা হয়। মেডিটেশনের জন্য আগর তেল ও আগর কাঠের ধূম্র ব্যবহার করা হয়। মালয়েশিয়া, চীন এবং ভারতীয় উপমহাদেশে ইউনানী ও আয়ুর্বেদী চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুযায়ী বহুবিদ ঔষধ উৎপাদনে আগর তেল ও আগর কাঠ ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অ্যারোমাথেরাপিতে আগর আতর ব্যবহার করা হয়। আগর আতরের পাশাপাশি আগর কাঠের গুড়া বা পাউডার ধূপের ন্যায় প্রজ্জলনের মাধ্যমে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জাতি বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং মুসলিম ধর্মালম্বী সকলেই আগর আতর ও আগর কাঠের গুড়া ব্যবহার করে থাকে। আতর বাংলাদেশে তরল সোনা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।

আগর গাছের উৎপাদন কৌশল

আগর গাছ উৎপাদনে তেমন কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন নেই। প্রচলিত নিয়মেই এর চাষাবাদ করা হয়। বাড়ির আঙ্গিনায়, রাস্তার পাশে, পতিত জমি, টিলার ঢালে, টিলা বা পাহাড়ে এমনকি পরিত্যক্ত জায়গায় আগর গাছ লাগানো যায়। এ গাছের জন্য তেমন জায়গার প্রয়োজন হয় না। পাহাড় বা টিলা জমিতে আগর গাছ ভাল জন্মে। তবে সব জমিতেই কমবেশি জন্মে থাকে। আগর গাছ উৎপাদনের কিছু কৌশল সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো।

মাটি ও জলবায়ু : সাধারণত উঁচু জমি হলে ভাল হয়। তবে সুনিষ্কাশিত পাহাড়ী মাটি আগর গাছ চাষের খুবই উপযোগী। মাটির প্রতিক্রিয়া ৪.০০ থেকে ৬.০০ (মাটির পিএইচ মান) হলে খুব ভালো। গড় বৃষ্টিপাত ২০০০ সেমি এর কম, তাছাড়া গড় তাপমাত্রা ২৭ থেকে ৩২ ডিগ্রী সেলসিয়াস আগর গাছের বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। অম্লীয় মাটি এবং এ মাটির সাথে সংশ্লিষ্ট অণুজীবাণুগুলো আগর গাছের জন্য মিথোজীবিতা হিসেবে কাজ করে থাকে।

চারা তৈরি: গাঢ় বাদামী বর্ণের ১.৫ থেকে ২.০০ ইঞ্চি লম্বা ক্যাপসুল জাতীয় ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। প্রতি ফলে দুটো বীজ হয়ে থাকে। বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা খুব অল্প সময়ের জন্য থাকে। সাধারণত ৭ থেকে ১০ দিন পর্যন্ত অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা স্থায়ী থাকে। বীজ থেকে চারা তৈরি করা হয়। বীজ বপনের উৎকৃষ্ট সময় মার্চ-এপ্রিল। চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হয়। প্রথমে বালুর বেডে বীজগুলো বিছিয়ে দিয়ে উপরে আবারও বালু দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এখানে বীজগুলো অঙ্কুরিত হয়। প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পরে পলিব্যাগে চারা স্থানান্তরিত হয়। চারা গজানোর জন্য অস্থায়ী শেডের ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। চারায় নিয়মিত পানি সেচের ব্যবস্থা রাখতে হয়।

চারা রোপণ: বর্ষা মৌসুম আগর গাছের চারা রোপণের উৎকৃষ্ট সময়। বাংলাদেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে আগরের চারা রোপণ করলে গাছ টিকে বেশি। স্কুল, কলেজ, রাস্তা দুই পাশেও আগরের চারা রোপণ করা যায়। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতেও আগর গাছ লাগানো যেতে পারে। রোপণের সময় প্রতিটি গর্তে জৈব সার/ কম্পোস্ট সার, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম সার গাছের বয়স অনুযায়ী প্রয়োগ করা যেতে পারে। রোপণের সময় সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫-৬ ফুট এবং চারা থেকে চারার দুরত্ব ৩-৪ ফুট বজায় রাখা উত্তম। সাধারণত ১-২ বছর বয়সী আগরের চারা লাগানো হয়। একক বাগানের ক্ষেত্রে কম দূরত্ব এবং মিশ্র বাগানের ক্ষেত্রে একটু বেশি দূরত্ব রাখা উচিত। অন্যান্য গাছের ন্যায় চারা রোপণের পূর্বে দৈর্ঘ্যে ৫০ সেমি, প্রস্থে ৫০ সেমি এবং গভীরতায় ৫০ সেমি আকারের গর্ত তৈরি করে পচা গোবর ও সার প্রয়োগ করা ভালো।

আন্ত:ফসল: সাধারণত প্রথম ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত মিশ্র ফসল যেমন শাকসবজি ও ডাল জাতীয় ফসল চাষ করা যায়। পরবর্তীতে কয়েক বছর ছায়া পছন্দকারী সর্পগন্ধা ঔষধি গাছের আবাদ করা যায়। আদা এবং হলুদও চাষ করা হয়ে থাকে। তাছাড়া সুপারি, কফি, রাবার, পামগাছ সহ অধিকাংশ বনজ গাছ আগর গাছের সাথে মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। বিভিন্ন দেশে এলাচও চাষ করে। ভারতে চা বাগানে ছায়া প্রদানকারী হিসেবে আগর গাছ লাগানো হয়। ইদানিং অনেক পরীক্ষামূলকভাবে চাষি পান ও গোল মরিচ চাষের ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মিশ্র ফসল হিসেবে যে ফসলই চাষ করা হয় না কেন, আগর গাছের গোড়ার চারপাশ (প্রায় ২০ ইঞ্চি পরিমাণ) অবশ্যই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

আন্ত:পরিচর্যা
খরা মৌসুমে পানি সেচ দিতে হয়। প্রয়োজন মতো আগাছা দমন করতে হবে। তাছাড়া নিয়ম করে কিছু রাসায়নিক সার দিলে গাছের বৃদ্ধি দ্রুত হয়। এক্ষেত্রে নতুন আগর গাছের বাগানে কোন রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। আগর গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সার ব্যবহার করা যায়। এক্ষেত্রে একবার বর্ষার আগে এবং একবার বর্ষার পরে অথ্যার্ৎ বছরে দুইবার সার প্রয়োগ করা উত্তম।

 

আগরের রোগ ও পোকা মাকড়

আগরের তেমন কোন রোগ হয় না তবে মাঝে মাঝে গোড়া পচা রোগ এবং ডাইব্যাক রোগে গাছের ডালপালা শুকিয়ে যায়। তবে প্রয়োজনীয় ছত্রাকনাশক যেমন টিল্ট/স্কোর প্রয়োগ করে ভাল ফল পাওয়া যায়। আগর চাষের ক্ষেত্রে বিছা পোকা পাতা ঝাঝরা করে ফেলে। তবে সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক ব্যবহার করে বিছা পোকার আক্রমন দমানো যায়।

আগর সংগ্রহের সময়

প্রাকৃতিকভাবে আগর গাছে আগর তৈরি হতে ২৫-৩০ বছর সময় লেগে যায়। তবে কৃত্রিমভাবে ৫-৬ বছর বয়সী আগর গাছে পেরেক মেরে এসব গাছ ১৫-১৬ বছর হলেই আগর কাঠ সংগ্রহ করা যায়। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো যে, আগর কাঠ সংগ্রহের জন্য গাছ কর্তনের উপযোগী হয়েছে কিনা তা বিবেচনা করা হয় মূলত গাছ কতটুকু রুগ্ন হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে। গাছের বয়স, গাছের বৃদ্ধি ও শারীরতাত্ত্বীয় পরিপক্কতা বিবেচনা করে আগর গাছ কর্তন করা হয় না বরং গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাওয়া, দৃশ্যমান ক্ষতযুক্ত কান্ড, কাঠের বিকৃতি, ক্ষুদ্র পাতা, মূল কান্ড ও শাখার উপর মরা লক্ষণ এসব দেখে আগর কাঠ কর্তন করা ও সংগ্রহ করা হয়। সারা বছরই আগর কাঠ সংগ্রহ করা গেলেও জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসই আগর কাঠ সংগ্রহের উৎকৃষ্ট সময়। এসময় গাছ সুপ্ত অবস্থায় থাকে বলে আগর কাঠে আতর বা তেলের পরিমাণ বেশি ও গুণগত মানের পাওয়া যায়। একটি প্রাপ্ত বয়স্ক গাছ থেকে ২.০ থেকে ২.৫ কেজি পরিমাণ আগর কাঠ পাওয়া যায়।

আগর গাছে আগর তৈরির কলাকৌশল
আগর গাছের নির্যাস থেকেই আতর তৈরি হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে একটি আগর গাছে ২৫ থেকে ৩০ বছর এমনকি ৫০ বছর বয়সে গাছের সুনির্দিষ্ট কাষ্ঠল অংশে (জাইলেম) রেজিনযুক্ত যৌগিক পদার্থ তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে প্রক্রিয়াজাত করে আগর আতর তেল বা সুগন্ধি উৎপাদন করা হয়। সাধারণত আগর গাছ আঘাত প্রাপ্ত হলে বা পোকা/ছত্রাক কর্তৃক আক্রান্ত হলে ক্ষতস্থানে/আক্রান্ত স্থানে গাছের জৈবনিক প্রতিরোধ (স্থানীয় ভাষায় এন্টিবডি) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছে আগর সঞ্চিত হয়। আগর গাছ কীটপতঙ্গের (একপ্রকার ছিদ্রকারী পোকা) আক্রমনে রস বের হয়, অত:পর সেই রসে ছত্রাক আক্রমণ করে গাছের কাষ্টল অংশ (জাইলেম) আক্রান্ত হয়, পরবর্তীতে এই আক্রান্ত কাষ্ঠল অংশে জৈবনিক প্রক্রিয়ায় আগর সঞ্চিত হয়। অর্থ্যাৎ আক্রান্ত গাছ তার নিজের মধ্যে এক ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করে। এতে করে Sesquiterpenes নামক রেজিনযুক্ত যৌগিক পদার্থ তৈরি হয়। এই রেজিনযুক্ত যৌগিক পদার্থই কাঙ্খিত আগর কাঠ। আগর গাছে Zinzera conferta প্রজাতির একধরনের কান্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। কান্ড ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণের ফলে আগর গাছ থেকে আঠালো পদার্থ বের হয়। এই আঠালো পদার্থে Aspergillus spp., Botryodiplodia spp., Diplodia spp., Fusarium spp., Penicillium spp., Phythium spp. এসব ছত্রাক জীবাণু দ্বারা আক্রমণ হয়। ফলে আগর গাছ নিজস্ব প্রতিরক্ষায় ব্যতিক্রমী এ রেজিনযুক্ত যৌগিক পদার্থ নি:সৃত করে। এক গবেষণায় Aquilaria malaccenesis প্রজাতির আগর কাঠে প্রায় ৫৫ প্রকারের রাসায়নিক উপাদান সনাক্ত করতে পেরেছে। তাদের মধ্যে আগর কাঠে মূলত ৩-ফিনাইল-২-বিউটানন; আলফা কিউববেন; বেনজাইল এসিটোন এসব রাসায়নিক উপাদান উল্লেখযোগ্য যা সুগন্ধি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

আগর গাছে দুইভাবে আগর তৈরি হয়। যথা:

১) প্রাকৃতিক পদ্ধতি প্রাকৃতিক উপায়ে আগর গাছ হতে আগর উৎপন্ন হতে প্রায় ২৫-৩০ এমনকি ৫০ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। তবে আগর গাছের বয়স ৫-১০ বছর থেকেই গাছে আগর জমা হতে থাকে। এক্ষেত্রে গাছের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে কালো বর্ণ ধারণ করে। দেখতে ছোপ ছোপ আকারে অনেকটা সারী কাঠের মত। তবে সারী কাঠ যেমন অনেকটা বা পুরোটা অংশ জুড়ে কালো হয় এক্ষেত্রে ঠিক তেমনটি হয় না। আগর গাছে নির্দিষ্ট স্থানে কালো হওয়া শুরু হলে তা পূর্ণ হতে প্রায় চার থেকে ছয় বছর লেগে যায়। এটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি। গাছের এ কালো অংশকেই বলা হয় আগর বা আগর কাঠ।

২) কৃত্রিম পদ্ধতি এক ধরনের কান্ডছেদক পোকা আগর গাছে ছিদ্র তৈরি করে পরে সেখানে ছত্রাকের আক্রমণে গাছ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে গিয়ে জৈবনিক প্রক্রিয়ায় আগর গাছের ঐ ক্ষত স্থানের চারপাশে বাদামী/কালো রং এর আস্তরন তৈরী হয় যা আগর উৎপাদনের মূল উপকরণ। এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ কৃত্রিমভাবে পেরেক মেরে ক্ষত সৃষ্টি করে, ফলে সেখানে আগর সঞ্চিত হয়। এ পদ্ধতিতে খুব কম সময়ে আগর গাছ থেকে আতর তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে ১০-১২ বছরের ১০-১২ ইঞ্চি পরিধির আগর গাছের গায়ে ৪-৫ ইঞ্চি পরপর সারিবদ্ধভাবে গাছের নিচ থেকে শুরু করে উপর পর্যন্ত প্যারেক (তারকাটা) গেঁথে দেয়া হয়। (সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ১-২ ইঞ্চি পরপর সারিবদ্ধভাবে ১.৫ থেকে ২.০ ইঞ্চি সাইজের তারকাটা ৪ থেকে ৫ বছর বয়সী গাছে লাগানো হয়েছে। তারকাটা লাগানোর সময় একটা কৌশল হিসেবে অর্ধেক অংশ পরিমাণ তারকাটা গাছের কান্ডে ডুকানো হয়, একটু আড়াআড়িভাবে লাগানো পেরেকের বাহিরের অংশটুকু গাছের বৃদ্ধির সাথে সাথে কান্ডের ভিতর ডুকে যায়) গাছের তারকাটা গাঁথা অংশে কৃত্রিমভাবে আঘাতের ফলে ছত্রাকের আক্রমন সহজেই ঘটে ফলে তারকাটার চারপাশের কাঠে ৫-৬ বছরের মধ্যেই বাদামী-কালো রং এর আস্তরন তৈরী হয়। পরে সে গাছগুলো কেটে আগর-আতর উৎপাদনের কাঁচামাল বের করা হয়। সাধারণত গাছের পুরুত্ব ও আকারের উপর তারকাট পোতা নির্ভর করে। এক্ষেত্রে গাছের বয়সটা মূখ্য নয়।

আগর গাছ থেকে আতর প্রস্তুত করার কলাকৌশল

আগর বাগান থেকে পূর্ণ বয়স্ক আগর গাছ কেটে এনে প্রথমে তা টুকরো টুকরো (স্থানীয় ভাষায় লগ) করে কেটে আলাদা করা হয়। এই টুকরোগুলোকে দুইভাগে আলাদা করা হয়। এক ভাগে ঘন কালো, হালকা কালো, তামাটে, অল্প তামাটে বর্ণের কাঠের টুকরা এবং অন্য ভাগে ধূসর, প্রায় সাদা বর্ণের কাঠের টুকরা থাকে। হালকা কালো, তামাটে ও অল্প তামাটে রঙের আগর কাঠের লগগুলোকে লম্বালম্বিভাবে চেরা হয়। লম্বালম্বি চেরাগুলোকে ফালি বলা হয়। ফালিগুলো থেকে সাবধানতার সাথে তারকাটাগুলোকে সরানো হয়। ফালিগুলো অত্যন্ত যতœ ও সুনিপুণভাবে করা হয় যেন কালো অংশ বা আগরগুলি আস্ত থাকে। চেরা ফালিগুলো স্থানীয় ভাষায় ধুম বলে। কারখানাগুলোতে ধুম তৈরির কাজগুলো মূলত মহিলারা করে থাকেন। কথা বলে জানা গেছে তাদের দৈনিক মজুরী ২০০ টাকা। ধুম করার পর কাঠের ফালিগুলোকে কুচি কুচি (ছোট ছোট টুকরা) করে কাটা হয়। চেরা ফালিগুলো (ধুম) কুচি কুচি করতে দা ব্যবহারের পাশাপাশি অনেক কারখানায় মেশিন ব্যবহার করা হয়। এরপর কুচি কুচি করে কাটা টুকরোগুলো একটি পাত্রে বা পানির ট্যাঙ্ক, ড্রাম, বড় হাড়ি ইত্যাদিতে (স্থানীয় ভাষায় ডেগ বলে) ১০ থেকে ১৫ দিন পর্যন্ত ভিজিয়ে রাখা হয়। ভিজিয়ে রাখা কাটা কাঠগুলো তুলে চালনির সাহায্য পানি ঝড়িয়ে ঢেকি দিয়ে গুড়ো করা হয়। স্থানীয় ভাষায় কাঠের গুড়া অংশগুলোকে ছুরন বলা হয়। ছুরনগুলোকে আবারও কমপক্ষে আট থেকে দশ দিন ভিজিয়ে রাখতে হয় (উল্লেখ্য যে, ডেগে ভিজিয়ে রাখার ব্যাপারে অনেকে দুইবার আবার অনেকে একবারও করে থাকে)। ছুরনগুলো খুব ভালভাবে পচে গেলে ডেগ থেকে তুলে নিয়ে একটি পানি ভর্তি পাত্রের (স্টিলের তৈরি বিশেষ পাত্র) মধ্যে রেখে পরবর্তীতে নিচ থেকে আগুনে তাপ দিতে হয়। পাত্রের চারিদিক খুব ভালভাবে বন্ধ করা থাকে, অনেকটা এয়ার টাইটের মতো। এভাবে অনবরত ১০ থেকে ১২ দিন তাপ প্রয়োগ করতে হয়। পাত্রের উপরের দিকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় একটা নল সংযুক্ত করা হয় এবং নলটির অপরপ্রান্ত আরেকটি পাত্রের সাথে সংযুক্ত করা থাকে। নলটি অন্য একটি ঠান্ডা পানি ভর্তি স্টিলের তৈরি দিয়ে পরিচালিত করে অন্য পাত্রের সাথে সংযুক্ত করা হয়। ( এখানে স্টিলের তৈরি পাত্রটিতে ঠান্ডা পানি ভর্তি থাকে, ফলে নলের মধ্য দিয়ে ভেসে আসা বাষ্পগুলো ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে এসে সহজেই ফোটায় ফোটায় পানিতে পরিণত হয়, ফোটায় ফোটায় পানিগুলো নলের অপর প্রান্তে রাখা পাত্রে জমা হয়)। আগুনের তাপে ছুরন কাঠ সিদ্ধ হয়ে বাষ্পাকারে উপরের নলে প্রবেশ করে এবং বাষ্পগুলো ঘনীভূত হয়ে অপর প্রান্তের পাত্রের মধ্যে ফোটায় ফোটায় পড়তে থাকে। ঘনীভূত বাষ্প পানি হয়ে নির্দিষ্ট পাত্রে জমতে থাকে এবং তার উপর তেলের আস্তরণ পড়ে। তেলের এই আস্তরনই আগর আতর তেল। পরবর্তীতে পানির উপর থেকে তেলের অংশটিকে সংগ্রহ করা হয়। এটি মূলত বাষ্পীভবন-শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় বিশেষ পাতন প্রক্রিয়া। এক সঙ্গে একটি ডেগে ২ থেকে ৩ মন পরিমাণ ছুরন (আগর চিপস/আগর কাঠের টুকরো) ভর্তি করা যায়। এক ডেগ ছুরন জ্বাল দিয়ে ৮-৯ তোলা আতর পাওয়া যায়। একতোলা আতর প্রায় ১২ গ্রাম (১১.৬) পরিমাণ। প্রাপ্ত তথ্য মতে আতর বের করার পর উচ্ছিষ্টগুলো আগর বাতির ফ্যাক্টরিতে বিক্রি করা হয়। তাছাড়া উচ্ছিষ্ট অংশগুলোও মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করা হয়।

বড়লেখা উপজেলায় আগর-আতর শিল্প বিষয়ক তথ্যাদি

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মোতাবেক বড়লেখা উপজেলায় প্রায় ৪৫০ হেক্টর পরিমাণ জমিতে আগর চাষ হয়ে থাকে। বেসরকারী বা ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানের সংখ্যা প্রায় ১০০০টি। বেসরকারী/ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগানে চারার সংখ্যা প্রায় ২-৩ কোটি। উপজেলায় ছোট-বড় নার্সারীর সংখ্যা প্রায় ৫০০টি। আতর উৎপাদনের জন্য কারখানা রয়েছে প্রায় ৩৫০-৪০০টি। ঘরোয়াভাবে স্থাপিত কারখানাগুলোতে মোট ডেগের সংখ্যা প্রায় ১০০০টি। উপজেলায় বৎসরে প্রায় ০৯ মাস কারখানায় আতর উৎপন্ন হয়। প্রতি ডেগে বার্ষিক উৎপাদিত আতর প্রায় ১০০ তোলা। প্রাপ্ত বয়স্ক ১টি আগর গাছ থেকে গড়ে ১.৫-২.০ কেজি আগর কাঠ পাওয়া যায়। প্রতি তোলা আতরের স্থানীয় বাজার মূল্য ৫০০০-৭০০০ টাকা। আগর চিপ্স (গাছের উচ্ছিষ্ট অংশগুলো) ও আতর ১০০% রপ্তানীমূখী। বড়লেখা উপজেলার উৎপাদিত আতর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন-কাতার, কুয়েত, দুবাই, সৌদি আরব এসব দেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। এ উপজেলায় আগর-আতর শিল্পে (নার্সারী, বাগান পরিচর্যা, কারখানা ইত্যাদি) নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।

আগরের বাজার ব্যবস্থাপনা

সারা বিশ্বে আগর আতর পণ্যের প্রায় ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি বাজার রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমূহে আগর উড চিপস ও আতরের খুব চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে আগর কাঠের বিভিন্ন প্রকার মান রয়েছে যথা- ডবল সুপার, আগর প্রপার, কলাগাছি আগর, ডোম আগর ইত্যাদি। আগর আতর শিল্প থেকে দেশি ও বিদেশী অনেক আতর তৈরি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জান্নাতুল নাঈম, জান্নাতুল ফেরদাউস, শাইখা, হাজরে আসওয়াদ, সুলতান, উদ, কিং হোয়াইট, আল ফারেজ, কুল ওয়াটার এসব নামের আতর বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। আগর কাঠের বাজার দর প্রতি কেজি পাঁচ ডলার থেকে দশ হাজার ডলার। গুণগত মানের উপর নির্ভর করে এক তোলা আতর ৫-১৫ হাজার পর্যন্ত বিক্রি হয়। তাছাড়া আগর গাছের ডাস্ট বা উচ্ছিষ্টগুলোও রপ্তানিযোগ্য। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিংগাপুর, তাইওয়ান, সৌদিআরব সহ অন্যান্য দেশে এসব ডাস্ট প্রক্রিয়াজাত করে ২০-২২ টি পণ্য উৎপাদন করে। আগর তেলের মান বহুবিদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মান অনুযায়ী আগর কাঠের দামও কম-বেশী হতে পারে। প্রাথমিক বিবেচনায় দাম নির্ধারণে কাঠের মান ও উৎপাদনকারী দেশের উপর নির্ভর করে। ভিন্ন ভিন্ন দেশের গ্রাহক বা ব্যবসায়ীগণ ভিন্ন ভিন্ন গুণাবলী বিবেচনায় রেখে আগর কাঠের মান/দাম নির্ধারণ করে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে আগর কাঠের তেল থেকে প্রাপ্ত গন্ধ বা সুরভী মূখ্য বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সিংগাপুর আগর ব্যবসার মূলকেন্দ্র। প্রধান প্রধান উৎপাদনকারী দেশসমূহের মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া অন্যতম।

লাভজনক ব্যবসা আগর শিল্প
আগর-আতর উৎপাদন অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। এ ব্যবসায় অল্প পুঁিজ বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা আয় করা সম্ভব। এককেজি কালো কাঠের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা। একটি আগর কাঠ সমৃদ্ধ প্রাপ্ত বয়স্ক গাছের মূল্য ৫-১০ লাখ এমনকি ২০-২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ব্রাকের এক গবেষণায় দেখা যায়, আগর প্লান্টেশনে বিনিয়োগ করে উচ্চ মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। ব্রাকের এক জরিপে সঞ্চয়পত্রে ১ ডলার বিনিয়োগ করলে ১২ বছর পর ৪.২১ ডলার পাওয়া যায়, অপরদিকে আগর গাছে ১ ডলার বিনিয়োগ করলে ১১৭ থেকে ৭৩৬ ডলার আশা করা যায়। তাছাড়া আগর শিল্প একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প।

আগর শিল্পের নানাবিধ সমস্যাসমূহ

আগর শিল্পে নানাবিধ সমস্যাদি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সমস্যা হলো আধুনিক কারিগরি জ্ঞানের অভাব। সনাতন চাষ পদ্ধতি ও নিম্ন মানের পণ্য। অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ব্যবস্থা (তথ্যসূত্রে জানা যায়, রপ্তানিকৃত আগর আতরের মূল্যমান প্রায়শই নগদ ক্যাশে নিয়ে আসা হয়- এক্ষেত্রে সরকার শুল্ক সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে তাছাড়া সরকারি কর্তৃপক্ষের অগোচরে নগদ ক্যাশে কিভাবে টাকা আনে সেটাও প্রশ্নবিদ্ধ) ও উচ্চ রপ্তানি শুল্ক। আগর শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ট্রানজিট পারমিট (টিপি) সমস্যা আগর গাছ ক্রয় করে আহরণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে টিপি প্রাপ্তি অত্যন্ত জটিল, ফলে রপ্তানি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। | CITES (Convention on International Trade in Endangered in Flora & Fauna) সনদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সমস্যা। শুল্ক সংক্রান্ত বিধি বিধানে জটিলতার কারণে রপ্তানী সমস্যা। একটি বিষয় উল্লেখ করার মতো তা হলো, বাংলাদেশে উৎপাদিত আগর আতর তেল রিফাইনিং (পরিশোধিত) করার ব্যবস্থা নাই। অপরিশোধিত আগর আতর অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে বিক্রি করতে হয় এবং এই সুবিধাটুকু মধ্যপ্রাচ্যের অনেক প্রতিষ্ঠান কাজে লাগিয়ে শুধু রিফাইনিং করেই কয়েকগুণ বেশি টাকা আয় করে নিচ্ছে (ডিম পাড়ে হাসে, খায় বাঘডাসে)। এক্ষেত্রে আগর আতর রিফাইনিং ব্যবস্থাপনার অভাব একটা বড় সমস্যা।

আগর শিল্প বিকাশে সুপারিশমালা

অবিশ্বাস্য সম্ভাবনাময় আগর আতর শিল্পের বিকাশে এ শিল্পকে ঢেলে সাজাতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, পলিসি, উদ্যোগ ও উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়ন। আগর শিল্পের মানোন্নয়নে কতগুলো সুপারিশ উপস্থাপিত হলো তা- সরকারি উদ্যোগে আগর নিয়ে আধুনিক মানসম্মত গবেষনা করা উচিত। এ ব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মী, উদ্যোক্তা, আগর শ্রমিক, কারিগরদের যতাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। আগর থেকে বিশ্বমানের প্রসাধনী পণ্য সামগ্রী তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করা। সরকারী উদ্যোগে ঋণ সুবিধা প্রদান করা। সরকারী খাস জমি বিশেষ করে টিলাগুলো লিজ প্রদান করা। আগর শিল্পের জন্য পৃথক অবকাঠামো ও বিসিক শিল্প নগরী স্থাপন করা। গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল খাতে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা। রপ্তানী প্রক্রিয়া সহজতর করতে ফরওয়ার্ড লিংকেজের ব্যবস্থা করা। প্রাকৃতিক আগর দিয়ে উৎপাদিত প্রসাধনীর আনুষাঙ্গিক রাসায়নিক দ্রব্যাদি আমদানী সুবিধা বৃদ্ধি করা (শুল্কমুক্ত করা) যাতে দেশীয় পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি করে অধিক মূল্যে রপ্তানী করা সহজতর হয়। ট্যাক্স হলিডে (শুল্ক রেয়াত) সুবিধা দেয়া। সমন্বিত গবেষণার জন্য আগর উন্নয়ন বোর্ড/সেল গঠন করা। সরকারী উদ্যোগে গবেষণা এবং প্যাটেন্টরাইট প্রদানের ব্যবস্থা করা। সর্বোপরি কৃষি বিভাগ, বন বিভাগ, কাস্টমস বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, বিজিবি ও বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্ঠা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা।

আগর শিল্পের সম্ভাবনা

বাংলাদেশে বর্তমানে সিলেট তথা মৌলভীবাজার, চট্রগ্রাম ও পার্বত্য চট্রগ্রামে আগর চাষ করার উপযোগী জায়গা রয়েছে। গতানুগতিক বা সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে কৃত্রিম পদ্ধতির মাধ্যমে স্বল্প সময়ে বেশি পরিমাণ আগর ও আগরজাত দ্রব্যাদি উৎপাদন করা সম্ভব। বড়লেখা উপজেলায় ছোট বড় প্রায় ৩০০টি আগর আতর ফ্যাক্টরি রয়েছে। এ এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আরোও আগর কারখানা তৈরি সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশী অনেক ব্যক্তি দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আগর শিল্প গড়ে তুলেছেন। এসব শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকই বাংলাদেশী। কাঁচামাল আমদানী সংক্রান্ত জটিলতা দূরীভূত হলে আমাদের দেশে এ শিল্প সমূহ স্থাপন করা সম্ভব হবে এবং দেশীয় শ্রমের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে ফলে গ্রামীন অর্থনৈতিক উন্নয়ন হবে।

আগর-আতর শিল্পে সরকারী উদ্যোগ

গ্রামীন ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের পূন:জীবন এর উদ্দেশ্যে এবং দেশজ ১০০ ভাগ কাঁচামাল ভিত্তিক রপ্তানীখাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পণ্যটিকে মৌলভীবাজার জেলার জন্য রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো কর্তৃক গৃহীত ঙহব উরংঃৎরপঃ ঙহব চৎড়ফঁপঃ (ঙউঙচ) কর্মসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। সরকারিভাবে আগর গাছ সৃজন, কৃত্রিম উপায়ে আগর গাছে আগর সৃষ্টিসহ বিবিধ উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বন বিভাগ এ শিল্পের কাঁচামাল “আগর বৃক্ষ সৃজন প্রকল্প” নামে প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে এর কাঁচামাল সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় সিলেট বিভাগের ১১টি এলাকায় ৩১৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩ লক্ষ আগর চারা লাগানো হয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রেমা বন বিট, সাতছড়ি রেঞ্জের সাতছড়ি বন বিট, রঘনন্দন রেঞ্জের শাহপুর বিট; মৌলভীবাজার জেলার লাউয়াছড়া এবং সিলেটের খাদিমপাড়ায় সরকারিভাবে আগর গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। বর্তমানে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সরকারিভাবে আতর উৎপাদন করা হচ্ছে।

উপসংহার
আগর গাছ ও আতর একটি অতি মূল্যবান সম্ভাবনাময় সুগন্ধি। আভিজাত্যের প্রতীক হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে এখনও এ আগর শিল্পটি অবিকশিত। অত্যন্ত শক্তিমান এ সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাছাড়া জাপান, ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশেও প্রসাধনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। চাহিদা বৃদ্ধির সাথে রপ্তানীমূখী এই শিল্পের বিকাশে জরুরী ভিত্তিতে আগর গাছের ওপর গবেষণা জোরদার, চাষ সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনাসহ প্রক্রিয়াজাতকরণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহাওে আধুনিকায়ন করার উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা উচিত। ব্যক্তি কর্তৃক উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে এসে সরকারি মাধ্যমে রপ্তানি নিশ্চিত করা দরকার। এতে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং গ্রামীন জনপদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাছাড়া পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখা সম্ভব। এ শিল্পের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে, ফলে দেশের সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হবে।

(তথ্য সূত্র : সরেজমিন আগর বাগান ও কারখানা পরিদর্শন, আগর চাষিদের সাথে কথোপকথন, কারখানা মালিকদের সাথে সাক্ষাতকার, উপজেলা কৃষি অফিস (বড়লেখা, জুড়ী); ডিডি অফিস-কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৌলভীবাজার; অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট অঞ্চল, সিলেট; বিভাগীয় বনকর্মকর্তার কার্যালয়, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্টি বিভাগের অগ্রজ ও অনুজ বন্ধুদের সহযোগিতা, সাধারণ মানুষের পারসেপশন এবং পরমপ্রিয় ইন্টারনেট )

 

- Advertisement -

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.