- Advertisement -

শীতকালীন সবজির মাঠ পরিচর্যা

সবজির মাঠ পরিচর্যা

708

- Advertisement -

 

শীতকালীন সবজির মাঠ পরিচর্যা

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

এখন কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়। কৃষক ভাইয়েরা মাঠে শীতকালীন সবজির মাঠ পরিচর্যা নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত। সবজি চাষাবাদ করা একটা চ্যালেঞ্জিং বিষয়। কারণ সবজি চাষে ব্যাপক মনোযোগী হয়ে পরিচর্যা করতে হয়। পাশাপাশি সবজি সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণের জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। শীতকালে আমাদের দেশে প্রধানত আলু, সীম, টমেটো, বরবটি, বেগুন, মূলা, বাঁধাকপি, ফুৃলকপি, গাজর, শসা, লালশাক, লাইশাক, মরিচ এসব সবজিই বেশি চাষ হয়ে থাকে। সবজি চাষ করা অনেকাংশে মানুষের শিশু বাচ্চা লালন পালনের করার মতো, প্রতিদিনই যার বিশেষ যত্ন আদর ও পরিচর্যা করতে হয়। তা না হলে সবজি উৎপাদন আশানুরুপ হয় না। সবজি চাষের ক্ষেত্রে বিশেষ যেসব পরিচর্যা করতে হয় তা হল নিয়মিত প্রয়োজনুসারে পানি সেচ দেয়া, নিড়ানী দেয়া, আগাছা দমন, পার্শ্ব  শাখা ও পাতা অপসারণ করা, মালচিং করা বা জাবড়া দেয়া, সার প্রয়োগ, গোড়ায় মাটি তোলা, বাউনি দেয়া, পরাগায়ন করা সবশেষে রোগ ও পোকামাকড় দমন করা।

পানি সেচ : শীতকালে সবজি চাষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পানি সেচ। কারণ এসময় মাটির আর্দ্রতা দ্রুত হ্রাস পায়। পানি সেচের জন্য নদী, খাল, ক্ষুদ্র জলাশয়, নলকুপ, পাম্প এসব উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে। সবজির জাত ও মাটির অবস্থা বুঝে পানি সেচ প্রদান করতে হয়। আলু,বাঁধাকপি,ফুলকপি এসব ফসলে নালা করে সেচ দিতে হয় এসব ফসলে পানির পরিমাণ বেশী লাগে। আবার সীম, টমেটো, লাইশাক, বেগুন এসব ফসলে ঝাঁঝরি দিয়ে মাদায় বা সরাসরি শিকড়ে পানি সেচ দেয়া যায় এতে পানির পরিমান কম লাগে। সবজির চারা রোপণের ৩-৪ দিন পর্যন্ত হালকা সেচ ও পরবর্তিতে প্রতি কিস্তি সার প্রয়োগের পর জমিতে সেচ দিতে হয়। আবার সবজি গাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না সেজন্য সেচ বা অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।

নিড়ানি দেয়া ও মাটি আলগা করা: পানি সেচের পর গাছের গোড়ায় মাটি শক্ত হয়ে যায়, তাই নিড়ানি দিতে হয়। এতে মাটি আলগা হয়, বাতাস চলাচল করে এবং শিকড় বিস্তার ভাল হয়ে থাকে। মাটি নিড়ানোর জন্য আচড়া, নিড়ানি বা খুরপি ব্যবহার করতে পারেন।

আগাছা দমন: সবজি ফসলে আগাছা দমন করে রাখতে হয়। কারণ আগাছা সবজি ফসলের সাথে পানি, আলো ও খাদ্য উপাদান নিয়ে প্রতিযোগিতা করে থাকে। তাছাড়া আগাছা রোগ ও পোকামাকড়ের আবাসস্থল। এতে ভাল ফলন পাওয়া যায় না। কোন ভাবেই সবজি ফসলে আগাছা জন্মাতে দেয়া যাবে না। আগাছা দমনের জন্য আচড়া, বিঁদা, খন্তা ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারেন।

মালচিং করা : সবজি ফসলে মালচিং করে পানি সেচের পরিমাণ কমানো যায়। এতে একদিকে যেমন পানি কম লাগে অন্যদিকে আগাছা দমন হয়ে থাকে। মালচিং হচ্ছে খড়কুটা, কচুরিপানা, পলিথিন দিয়ে মাটি ঢেকে দেয়া। যাতে পানি বাস্পায়িত কম হয় এবং আগাছা না জন্মাতে পারে। মালচিং দ্রব্যের মধ্যে পচনশীল দ্রব্য (খড়কুটা, কছুরিপানা) দিয়ে করা ভাল। কারণ এক সাথে মালচিং ও পরবর্তীতে তসা পচে জৈব দ্রব্য মাটিতে যোগ হয় মাটির উরর্বরতা বৃদ্ধি করে।

সার প্রয়োগ: সবজি চাষের জন্য প্রচুর পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া সুষম সার ব্যবহার করা খুবই প্রয়োজন। গাছের বয়স ও মাটির উর্বরতা ভেদে সারের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। সবচেয়ে ভালো হলো মাটি পরীক্ষা করে ফসলে সার দেয়া। সবজি ফসলে জমি তৈরির সময় সার দেয়ার পরও দুই কিস্তিতে সার দিতে হয়। প্রথম কিস্তি চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর এবং দ্বিতীয় কিস্তি মূলত গাছে ফুল আসার পূর্বে মাদায় খুব ভালোভাবে সার মাটির সাথে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হয়। সার প্রয়োগের সাথে সাথে হালকা সেচ দিতে হবে।

গোড়ায় মাটি তোলা(আর্থিং আপ): সবজির কোন কোন ফসল রয়েছে যাদের বড় হওয়ার সাথে সাথে গোড়ায় মাটি তোলে দিতে হয়। যেমন আলু, গাজর, মূলা, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি এসব ফসলের গোড়ায় মাটি তোলে দিতে হয়। গোড়ায় মাটি তোলে দেয়ার ফলে এসব ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায়।

বাউনি বা মাচা দেয়া : লতা জাতীয় সবজি ফসলে সঠিক বাউনি দেয়া খুবই প্রয়োজন। কারণ লতানো সবজির বাউনির উপর ফলন অনেকাংশে নির্ভর করে থাকে। বাউনি পছন্দকারী সবজি মধ্যে রয়েছে শীম, শসা, করলা, লাউ এসব। বাউনি সাধারণত বাঁশের কঞ্চি, পাটখড়ি, জিআই তার, প্লাস্টিক দড়ি এসব দিয়ে তৈরি করতে পারেন।

পার্শ্ব শাখা ও পাতা অপসারণ: পার্শ্ব শাখার ফলে গাছে ফলন কমে যায়। তাই সময়ে সময়ে পাশর্^ শাখা ও অতিরিক্ত পাতা সরিয়ে ফেলতে হবে। মিষ্টিকুমড়া, লাউ, করলা গাছেরপার্শ্ব শাখা ও পুরাতন পাতা কেটে দিলে গাছে আলো বাতাস প্রবেশ করে এবং রোগ বালাই কম হয় সর্বোপরি ফলন বেড়ে যায়।

প্যাচ খোলা ও ফুল বাছাই: লতানো সবজি যেমন সীম ও বরবটির প্যাচ খোলা ও ফুল বাছাই অত্যন্ত জরুরী। জমি থেকে উচ্ছিষ্ট ফুলগুলো হাতবাছাই করে জমিকে পরিষ্কার রাখতে হবে। কারণ এসব উচ্ছিষ্ট ফুলগুলোতে এবং অতিরিক্ত প্যাচ তৈরি হলে সেই প্যাচের গোড়া কুয়াশায় ভেজা থাকে, ফলে সহজেই জীবাণুর আবাসস্থল পাশাপাশি পোকামাকড়ের ডিম পাড়ার উৎকৃষ্ট স্থান।
পরাগায়ন: সবজি ফসল পরাগায়নের মাধ্যমে ফল উৎপাদন করে তাই প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম পারাগায়নের ব্যবস্থা করতে হয়। প্রাকৃতিক পরাগায়নের জন্য প্রজাপতি, বোলতা, মৌমাছি এসব পতঙ্গ আসার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য অযাচিতভাবে কীটনাশক ব্যবহার হতে বিরত থাকতে হবে। আবার সকাল বেলায় (৯.০০ টার আগে) কৃত্রিম পরাগায়নের ব্যবস্থা করতে পারেন। এতে ফসলে ফলনের মাত্রা বেড়ে যাবে।

রোগ ও পোকামাকড় দমন : সবজি ফসলে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকার আক্রমণ হয়ে থাকে। রোগের মধ্যে ছত্রাক,ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়াজনিত রোগ বেশী হয়ে থাকে। সবজি ফসলে বেশী দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে ছত্রাকজনিত গোড়া পঁচা, ঢলেপড়া, এনথ্রাকনোজ, ফল পঁচা এসব রোগ তাছাড়া ব্যাক্টেরিয়াজনিত গোড়া পঁচা, ঢলে পড়া আর ভাইরাসজনিত মোজাইক রোগ। মোজাইক রোগ দেখা মাত্রই গাছটি তুলে মাটিতে পুতে দিতে হবে, পচা জাতীয় রোগের জন্য ম্যানকোজেব বা কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। সবজি ফসলে জাব পোকা, পাতাখেকো লেদাপোকা, মাছি পোকা, শিকড় কাটা পোকা, ফলছিদ্রকরী পোকা আক্রমন করে। এসব পোকা দমনের জন্য পোকার জাতভেদে নির্ধারিত কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

সবজি ফসলের পরিচর্যার উপর নির্ভর করে ফলনের পার্থক্য হয়ে থাকে। কারণ সবজি ফসলে প্রতিদিন পরিচর্যার প্রয়োজন। ভাল ফলন পেতে হলে সবজি চাষে সঠিক পরিচর্যা করতে হবে।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.