- Advertisement -

শ্রাবণ মাসের  কৃষি

বারো মাসের কৃষি

629

- Advertisement -

 

শ্রাবণ মাসের  কৃষি

কৃষিবিদ মোহাইমিন

ঋতুরাণী বর্ষার দ্বিতীয় মাস শ্রাবণ। শ্রাবণের অথৈ পানি খালবিল, নদীনালা, পুকুর ডোবা ভরে উপচিয়ে পড়ে চারিদিক। ভাসিয়ে দেয় মাঠ-ঘাট, প্রান্তর এমকি বসত বাড়ির আঙ্গিনা। তিলতিল করে বিনিয়োগকৃত কষ্টের কৃষি তলিয়ে যায় সর্বনাশা পানির নিচে। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ঘামের ফসল তছনছ হলে কৃষক স্তব্দ হয়ে যায়, বেড়ে যায় কৃষির দুর্দশা। এরই মাঝে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়, মাঠে মাঠে সোনালী ফসল ফলাতে হয় । তাই আসুন আমরা জেনে নেই শ্রাবণ মাসের করণীয় প্রাসঙ্গিক কিছু কথা।
রোপা আমন– শ্রাবণ মাস আমন ধানের চারা রোপণের ভরা মৌসুম। এ মাসে উফশী জাতের রোপা আমন ধানের চারা মূল জমিতে রোপন করতে পারেন। চারার বয়স ৩০ দিন হলেই মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। স্থানীয় জাতের চেয়ে উফশী জাত উত্তম। আমনের চারা রোপণের আগে সবুজ সার ব্যবস্থাপনা করে নিয়ে খুবই ভাল হয়।  এটি মাটির জন্যও ভালো, কম খরচে অধিক ফলনে সহায়ক হয়। বর্তমানে সুগন্ধি এবং চিকন চালের বেশ চাহিদা থাকায় কাটারিভোগ, কালিজিরার মতো দেশী উন্নত জাত চাষ করে অধিক লাভবান হওয়া যায়। আমন ধানের ক্ষেতে সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করা দরকার। এ জন্য জমির উর্বরতা অনুসারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। সাধারণত প্রতি বিঘা বা ৩৩ শতক জমির জন্য রাসায়নিক সারের মাত্রা হলো ইউরিয়া ৫০-৬০ কেজি, টিএসপি ৩০-৩৩ কেজি, এমওপি ২৪ কেজি, জিপসাম ২০ কেজি এবং দস্তা সার ০৩ কেজি। ইউরিয়া ছাড়া বাকী সব অন্যান্য সার শেষ চাষের সময় জমিতে প্রয়োগ করুন। চারা রোপণের ১২-১৫ দিন পর প্রথম বার ইউরিয়া সার জমিতে উপরিপ্রয়োগ করুন। প্রথম উপরিপ্রয়োগের ১৫-২০ দিন পর দ্বিতীয়বার এবং তার ১৫-২০ দিন পর তৃতীয়বারে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করুন। তবে জমিতে সার দেওয়ার ব্যপারে মাটি পরীক্ষা করে সার দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে টাকার অপচয় কম হয় এবং মাটির স্বাস্থ্যও ভালো রাখা যায়। জমি তৈরি হওয়ার পর ২৫ সে.মি দূরে দূরে লাইন করে ১৫ সে.মি দূরে দূরে চারা রোপণ করুন। প্রতি গুছিতে ২/৩টি সুস্থ সবল চারা রোপণ করুন। পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য ধানের ক্ষেতে বাঁশের কঞ্চি বা ডাল পুঁতে দিন যাতে পাখি বসতে পারে এবং এসব পাখি পোকা ধরে খেতে পারে। ধান ক্ষেতের আগাছা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে অনুমোদিত আগাছানাশক ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রনে রাখা যায়। আপনি বালাইনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সঠিক ঔষধ, সঠিক সময়, সঠিক মাত্রা ও সঠিক নিয়মে ব্যবহার করবেন।

এ সময়ে আউশ ধান পাকে। পাকা আউশ ধান কেটে মাড়াই-ঝাড়াই করে শুকিয়ে নিন। এ কাজের জন্য আপনি থ্রেসার, উইনার, ড্রায়ার এসব যন্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। এতে বেশ সহজে এবং কম খরচে ধান মাড়াই-ঝাড়াই ও শুকানোর কাজটি করা যায়। জমির ধান প্রায় ৮০ ভাগ পাকা হয়ে গেলে অবশ্যই ধান কর্তন করে ঘরে তুলে নিতে হবে।

আপনার পাট ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি পাট গাছে ফুল আসলে পাট কাটতে হবে। এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং ফলনও ভালো পাওয়া যায়। পাট পচানোর জন্য আঁটি বেঁধে পাতা ঝরানোর ব্যবস্থা করুন এবং জাগ দিন। ইতোমধ্যে পাট পচে গেলে তা ছাড়ানোর ব্যবস্থা করুন। পাটের আঁশ ছাড়িয়ে ভালো করে ধোয়ার ৪০ লিটার পানিতে এক কেজি তেঁতুল গুলে তাতে আঁশ ৫-১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। এতে পাট উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করবে। ভালো মানের পাটের আঁশ পেতে রিবন রেটিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। বন্যার কারণে অনেক সময় সরাসরি পাট গাছ থেকে বীজ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাই এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পাটের ডগা বা কান্ড কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়ে তা থেকে খুব সহজেই বীজ উৎপাদন করা যায়। পাটের ডগা বা কান্ড ১৫-২২ সে.মি লম্বা করে কেটে কাদা করা জমিতে একটু কাত করে রোপণ করুন। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে প্রতি টুকরায় পাতাসহ ৩-৪টি কুঁড়ি থাকে।

এ সময় শিমের বীজ লাগাতে পারেন। তাছাড়া মুলার বীজও মাসে বপন করতে পারেন। বৃষ্টির দরুন গ্রীষ্মকালীন সবজির গোড়ায় পানি জমে থাকলে পানি নিকাশের ব্যবস্থা করতে হবে এবং গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে। লতাজাতীয় সবজির বাড়বাড়তি বেশি হলে ১৫-২০ ভাগ ডগা, পাতা কেটে দিতে পারেন। এতে ফুল ফল তাড়াতাড়ি আসবে।

আগাম শীতকালীন সবজি চাষ করতে হলে এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানে আগাম টমেটো, আগাম শিমসহ অন্যান্য উচ্চমূল্যের সবজি চাষ করা হয়।

প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও এসময়ে সারাদেশে গাছের চারা রোপণের কাজ চলছে পুরোদমে। ফলজ, বনজ এবং ওষুধি গাছের চারা বা কলম রোপনের ব্যবস্থা নিতে পারেন। উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে এক হাত চওড়া এবং এক হাত গভীর গর্ত করে অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক জৈব সারের সঙ্গে ১০০ গ্রাম টিএসপি এবং ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। সার ও মাটির এ মিশ্রণ গর্তে ভরাট করে রেখে দিন। ১০-১২ দিন পর গর্তে চারা রোপণ করতে পারেন। রোপনের জন্য চারা বা কলম হতে হবে স্বাস্থ্যবান ও ভালো জাতের। চারা রোপণ করে চারার গোড়ায় মাটি তুলে দিন ও খুঁটির সঙ্গে সোজা করে বেঁধে দিন। গরু-ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য রোপণ করা চারার চারপাশে বেড়া দিন। ফলের চারা রোপণের বেলায় কয়েকটি বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে- * ভালোজাতের সুস্থসবল নীরোগ চারা রোপণ করতে হবে। * প্রয়োজনে পানি সেচ বা নিকাশ ঠিকমত করতে হবে। * সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। * আগাছা পরিস্কার ও অন্যান্য পরিচর্যা ঠিকমত করতে হবে। * গাছ ছাঁটাইকরণ ও অন্যান্য পরিচর্যা এবং আইপিএম পদ্ধতিতে রোগ-পোকা নিয়ন্ত্রণ সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে করতে হবে। বারোমাসী ফলগাছের চারা বা কলম রোপণ করুন যাতে সারাবছর আপনি ফল পেতে পারেন। এতে পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে। আপনি যেসব ফলগাছ লাগাতে পারেন সেগুলো হলো- কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, কুল বেল, লেবু, কদবেল, বাতাবি লেবু, জাম, আতা, শরিফা, কামরাঙা, নারকেল লটকন, তেঁতুল, জলপাই এসব আরও অনেক ফল আছে।

আপনার গবাদি পশুকে জলজ ঘাসের সাথে শুকনো খড় মিশিয়ে খাওয়াতে পারেন। এ সময়ে কচুরিপানাসহ নানা ধরণের জলজ ঘাস পাওয়া যায়। একক ভাবে শুধু জলজ ঘাস খাওয়ালে গবাদিপশুর মল পাতলা হতে পারে। এসময় গবাদিপশু ও হাঁসমুরগির বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে। রোগের লক্ষণ ধরা পড়লে স্থানীয় প্রাণি চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া পশুপাখির রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা দেয়ার ব্যবস্থা নিন।

চারা পুকুরের মাছ ৫-৭ সে.মি পরিমাণ বড় হলে মজুদ পুকুরে ছাড়ার ব্যবস্থা নিন। সঙ্গে সঙ্গে গত বছর মজুদ পুকুরে ছাড়া মাছ বিক্রি করে করার ব্যবস্থা নিন। বন্যার কারণে মাছ যাতে পুকুর হতে বেরিয়ে যেতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য পুকুর পাড় বেঁধে উঁচু করে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পানি বেড়ে গেলে মাছের খাদ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ সময় পুকুরে প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে।

অত্যন্ত গুরুত্ব বিষয়, এই সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা থাকে। বন্যার বিষয়টি মাথায় রেখে আউশ ধান কর্তন, রোপা আমন ধানের চারা রোপন, আগাম শীতকালীন সবজি চাষের বিষয়গুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.