- Advertisement -

রোপা আউশ ধান উৎপাদন ব্যবস্থাপনা

616

- Advertisement -

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। কৃষি মৌসুমে এখন আউশ ধান চাষাবাদের উৎকৃষ্ট সময়। আধুনিক কলাকৌশল জেনে ও মেনে আউশ ধান আবাদ করলে বোরো ধানের ক্ষতির কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। তাই দেরি না করে এখনই আপনার অনাবাদি জমিতে আউশ ধান চাষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। অধিক ফলনের জন্য রোপা আউশ ধান উৎপাদন কৌশলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোপা আউশ ধান উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় যে কৌশলগুলো রয়েছে তা হলো গুণগত বীজ সংগ্রহ, সঠিক জাত নির্বাচন, আদর্শ বীজতলা তৈরি, মূল জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি, মাটি ও সার ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই-পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা, ফসল কর্তন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোকপাত করা হলো।

জাত নির্বাচন ও বীজতলা তৈরি

আগাম জাতের আউশ ধান যথা ব্রি ধান২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪২, ব্রি ধান৪৩, ব্রি ধান ৪৮, ব্রি ধান৫৫, ব্রি ধান৬৫, নেরিকা মিউটেন্ট চাষ করতে পারেন। শুরুতেই আদর্শ বীজতলায় হালিচারা উৎপাদন করতে হবে। তবে ক্রান্তিকালীন সময়ে ব্রি ধান২৮ এবং বিনাধান ১৪ জাতের ধান আউশ মৌসুমে লাগানো সম্ভব। তবে পরবর্তী ফসল হিসেবে আমন ধান আবাদে যেন সমস্যা না হয় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

চারার বয়স

রোপা আউশের চারা ২০-২৫ দিনের মধ্যে লাগাতে হবে। চারার বয়স বেশি হওয়ার কারণে ফলনের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, একদিন বিলম্বে রোপণের কারণে বিঘা প্রতি ৭-৮ কেজি ফলন কম হয়।

চারা উঠানো

যত্নের সঙ্গে চারা উঠাতে হবে। টানা হেঁচড়া করে গোড়ার মাটি পরিষ্কার করলে অনেক সময় চারার গোড়া ভেঙে যায় ফলে রোপণের পর বাড় বাড়তি কম হয়। তাই চারা উঠানোর সময় এসব বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।

চারা পরিবহন

বীজতলা থেকে রোপণের জন্য চারা বহন করার সময় পাতা ও মোড়ানো পরিহার করতে হবে। এজন্য ঝুড়ি বা টুকরিতে সারি করে সাজিয়ে পরিবহন করা উচিত। বস্তাবন্দি করে ধানের চারা কোনক্রমেই বহন করা যাবে না।

চারা রোপণ ও রোপণ দূরত্ব

রোপণের সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকলেই চলে। সারিতে চারা রোপণ করা উত্তম। এতে সব গাছ সমান আলো বাতাস ও পুষ্টি পায়। পরিচর্যা করা সহজ হয়। প্রতি গুছিতে একটি সবল চারা রোপণ করাই যথেষ্ট। এ হারে রোপণ করলে এক বিঘা জমিতে ১-১.৫ কেজি বীজের চারা লাগে। প্রয়োজনে ২-৩টি পর্যন্ত চারা এক গুছিতে রোপণ করা যেতে পারে। তখন দ্বিগুণ হারে বীজের প্রয়োজন হবে। চারা সব সময় অল্প গভীরে (১ ইঞ্চি) রোপণ করা উত্তম। এতে কুশির সংখ্যা বাড়ে এবং চারার বৃদ্ধি ভালো হয়। রোপণ সময়, ফসলের জাত, জমির উর্বরতা, এসবের ওপর রোপণ দূরত্ব নির্ভর করে। তবে কমপক্ষে সারি-সারি ৮-১০ ইঞ্চি এবং গুছি গুছি ৬ ইঞ্চি রাখা দরকার।

মূল জমি নির্বাচন ও জমি তৈরি

রোপা আউশ ধানের জন্য মূল জমি ছায়ামুক্ত, মোটামুটি সমতল, সেচ সুবিধাযুক্ত এবং বন্যামুক্ত হতে হবে। বীজের জমির পাশে অন্য জাতের ধান আবাদ করতে হলে কমপক্ষে ১২-১৫ হাত দূরে করতে হবে। জমিতে আগাছা-খড়কুটা থাকলে ধান রোপণের ৩ সপ্তাহ আগে চাষ করা দরকার। সম্ভব হলে শতক প্রতি ২০ কেজি জৈব সার প্রয়োগ করুন। ১ম চাষ দেয়ার ৩-৫ দিন পর মই দিরে আগাছা, খড়-কুটা মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। এ সময় জমির আইল সংস্কার করে পানি ধরে রাখুন। শেষ চাষে পাওয়ার টিলার বা গরুর লাঙল যেটাই ব্যবহার করুন জমি ৮-১০ ইঞ্চি গভীর করে চাষ দিতে হবে এবং মই দিয়ে জমি ভালোভাবে সমতল করতে হবে।

সার ব্যবস্থাপনা

পরিমিত পরিমাণে সুষম সার প্রয়োগ করুন। এজন্য সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে অথবা সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগের সহায়তায় কৃষি পরিবেশ অঞ্চল অনুযায়ী অনুমোদিত মাত্রায় সার প্রয়োগ করুন। সাধারণত এক বিঘা বা ৩৩ শতক জমিতে ২৩-২৪ কেজি ইউরিয়া, ৫-৬ কেজি টিএসপি, ৬-৭ কেজি এমওপি, ৪-৫ কেজি জিপসাম এবং ৬০০-৭০০ গ্রাম দস্তা সারের প্রয়োজন। মনে রাখবেন, জমির উর্বরতা ভেদে সারের পরিমাণ কম বেশি হবে। প্রতি ১০০ কেজি পঁচা গোবর সারে ১ কেজি ইউরিয়া, ৭৫০ গ্রাম টিএসপি এবং ১ কেজি এমওপি সার পাওয়া যায়। কাজেই রাসায়নিক সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদিত মাত্রা থেকে জৈব সার থেকে প্রাপ্ত বিয়োগ দিয়ে বাকিটুকু প্রয়োগ করতে হবে। ডিএপি সার প্রয়োগ করলে ২০% ইউরিয়া সার কম প্রয়োগ করুন।
আগাছা ব্যবস্থাপনা : চারা রোপণের ৪০ দিন পর্যন্ত জমি আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। কমপক্ষে দু’বার আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। প্রথমবার রোপণের ১৫ দিন পর এবং পরের বার ৩০-৩৫ দিন পর। উঠানো আগাছা যেখানে-সেখানে না ফেলে মাটির নিচে পুঁতে দিলে তা পচে গিয়ে জৈব সারের কাজ করে।

বালাই ব্যবস্থাপনা

যদি বীজ, সার, পানি ও আগাছা ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা হলে রোগ বালাইয়ের আক্রমণ কম হয়। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার আলোকে বালাই দমন করতে হবে। রোগের মধ্যে বাদামি দাগ, ব্লাস্ট, খোল পোড়া, পাতা পোড়া, উফরা, বাকানি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ক্ষতিকর পোকার মধ্যে মাজরা, বাদামি গাছ ফড়িং, পাতা মোড়ানো, নলি মাছি, পাতা মাছি, গান্ধী পোকা, শিষকাটা লেদা পোকা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। সাধারণ ব্যবস্থাপনা হিসেবে- নিয়মিত ফসল ক্ষেত জরিপ করতে হবে। চীন দেশীয় প্রবাদ আছে কৃষকের পায়ের ধুলা জমির সার। ফসল জমি পর্যবেক্ষণ করে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত ব্যবহার যেকোনো রোগ-পোকার আক্রমণ বাড়িয়ে দেয়। তাই পরিমিতি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। রোপণের সঙ্গে সঙ্গে জমিতে ধৈঞ্চার চারা বা ডালপালা পুঁতে দিতে হবে এতে পোকাখাদক পাখি শিকারের জন্য ক্ষেতে বসতে পারবে এবং ক্ষতিকর পোকা ধরে খাবে।

 

- Advertisement -

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.