- Advertisement -

রোপাআমন ধানের সাথে মিষ্টিকুমড়ার রিলে ফসল চাষ

রোপাআমন ধানের সাথে মিষ্টিকুমড়ার রিলে ফসল চাষ

825

- Advertisement -

 

রোপাআমন ধানের সাথে মিষ্টিকুমড়ার রিলে ফসল চাষ

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পুরণে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি তথা ফসল চাষের নিবিড়তা বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন। তাই বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত সাথী ফসল, আন্ত:ফসল, তিনফসল কিংবা চার ফসলভিত্তিক ফসল বিন্যস উপযুক্ততার ভিত্তিতে চাষাবাদ আজ সময়ের দাবি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন গবেষণা করে রোপা আমন ধানের সাথে সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টিকুমড়া চাষাবাদাদের প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন। প্রযুক্তিটি সিলেট অঞ্চলের জন্য খুবই উপকারি।

জমি ও মাটির প্রকার: মিষ্টি কুমড়া দ্রুত বর্ধনশীল একটি সবজি ফসল। যার প্রশস্ত পাতা ও বর্ধনশীল লতা দ্রুত মাটিতে আবৃত করে আর্দ্রতা সংরক্ষণে সহায়তা করে। যা সিলেট অঞ্চলের পতিত জমি ব্যবহারে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। নভেম্বর মাস থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে সাধারণত হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত হয় তাই যে-সমস্ত জমিতে পানি জমে না এবং কাছাকাছি পানি সেচের সুবিধা আছে এমন সব জমিতে রোপাআমন ধানের সাথে মিষ্টিকুমড়া সাথী ফসল হিসাবে খুব সহজেই চাষ করা সম্ভব। মিষ্টিকুমড়ার মাদায় পরিমিত সার ও সেচ দিলে এঁটেল-দোআঁশ, পলি-দোআঁশ এমনকি বেলে-দোআঁশ মাটিতেও লাভজনক হয়।

ফসলের জাত: অধিক ফল ধরে এমন যেকোনো দেশি জাতের মিষ্টিকুমড়ার বীজ বা চারা রোপণ বা বপন করা উত্তম। বারি মিষ্টিকুমড়ার-১, বারি মিষ্টিকুমড়ার-২ এবং বারি মিষ্টিকুমড়ার-৩ কিংবা মল্লিকা বা হাতিরপারা এসব জাতের মিষ্টিকুমড়ার ফলন বেশি হওয়ায় চাষ করা যেতে পারে।

বীজ বপনের সময় ও বীজের হার: সাথী ফসল হিসেবে মিষ্টিকুমড়া রবি মৌসুমে প্রারম্ভে রোপাআমন ধান কাটার ১৫- ২০ দিন পূর্বে মাদায় বীজ বপন উপযুক্ত সময় তবে একক ফসল হিসেবে চাষের ক্ষেত্রে, কৃষকেরা রোপাআমন ধান কেটে নভেম্বর-ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ) মাসে মিষ্টিকুমড়ার আবাদ করে থাকেন। বীজের হার বিঘাপ্রতি ৬৫০-৮০০ গ্রাম এবং হেক্টর প্রতি ৫-৬ কেজি।

মাদা তৈরি: রোপাআমন ধানের চারা রোপণের সময় মিষ্টিকুমড়ার বীজ বপনের জন্য আগে থেকেই ২ মিটার দ্ধ ২ মিটার দূরত্বে খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। উক্ত চিহ্নিত স্থানে আমন ধান পাকার ২৫-৩০ দিন পূর্বে ২৫ সে.মি দ্ধ ৩০ সে.মি দ্ধ ২৫ সে.মি আকারের গর্ত করে নিতে হবে। প্রতি গর্তে পরিমাণমত সার ব্যবহার করতে হবে।

বীজ বপন ও চারা তৈরি: রোপাআমন ধান কাটার ১৫-২০ দিন পূর্বে তৈরিকৃত মাদায় বীজ বপন করতে হবে কিংবা বীজতলায় প্রস্তুতকৃত ২৫-৩০ দিনের বয়সের চারা মাদায় রোপণ করতে হবে। কুমড়া বীজ পানিতে ১০-১৫ ঘন্টা প্রাইমিং করে তথা পানিতে ভিজিয়ে রেখে মাদায় বপন করলে বীজের অঙ্কুরোদগম সহজ ও দ্রুত হবে।

সারের মাত্রা ও প্রয়োগ পদ্ধতি: শতাংশ প্রতি জমিতে টিএসপি ৭০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৭২০ গ্রাম, জিপসাম ৬৫০ গ্রাম, এমওপি ৪০০ গ্রাম, দস্তা সার ৫০ গ্রাম, বোরাক্স ৪০ গ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড ৫০ গ্রাম ব্যবহার করতে হবে। জমি তৈরির সময় প্রচুর পচা গোবর বা কম্পোস্ট প্রয়োগ করা উচিত। প্রতি শতাংশে ৬ টি মাদা প্রস্তুত করা উত্তম।

আন্ত: পরিচর্যা: সেচ প্রয়োগ: মিষ্টি কুমড়া পানির প্রতি খুবই সংবেদনশীল। বিশেষ করে ফল ধরার সময় প্রয়োজনীয় পানির অভাব হলে শতকরা ৯০ ভাগ ফল ঝরে যেতে পারে। কাজেই প্রয়োজন অনুসারে নিয়মিত পানি দেয়া উত্তম। তবে সিলেট অঞ্চলে রবি মৌসুমে যেহেতু পানির অভাব থাকে তাই ঝাঝরি দিয়ে মাদায় সেচ দেয়া যেতে পারে। মিষ্টিকুমড়া গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফল ধারণের জন্য প্রতি মাদায় সপ্তাহে দুইবার ৮-১০ লিটার পানি সেচ দেয়া প্রয়োজন।

শোষক শাখা অপসারণ: মিষ্টি কুমড়া গাছের গোড়ার দিকে ছোট ছোট অনেক ডালপালা বের হয় যা শোষক শাখা নামে পরিচিতি। এগুলোকে গাছের গোড়ার দিক থেকে ৩৫-৪০ সেমি পর্যন্ত ধারালো চাকু দিয়ে কেটে অপসারণ করতে হবে। কারণ তা না করলে মূল শাখার বৃদ্ধি ব্যহত হয় এবং ফলধারণ কমে যায়। এই শোষক শাখাগুলো সবজি হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফল ধারণ বৃদ্ধিতে কৃত্রিম পরাগায়ণ: গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম পরাগায়নের মাধ্যমে মিষ্টি কুমড়ার ফলন শতকরা ২০-৩০ ভাগ বাড়ানো যায়। তবে মনে রাখতে হবে মিষ্টিকুমড়া যেহেতু পরপরাগী ফসল তাই সঠিক মাত্রায় পরাগায়ন না হলে ফলধারণ ব্যহত হয়। মিষ্টি কুমড়ার ফুল খুব সকালে ফোটে। নতুন প্রস্ফুটিত পুরুষ ফুল দিয়ে স্ত্রী ফুলের মাথায় ঘষা দিয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন কাজ সম্পন্ন করা যায়। কৃত্রিম পরাগায়ন সকাল ৯.০০ টার মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। নতুবা পুরুষ ফুলের রেণুগুলো শুকিয়ে যেতে পারে।

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা: কাট্ইু পোকা মিষ্টিকুমড়া চারা অবস্থায় কেটে নষ্ট করে। সকাল বেলায় কেটে দেয়া গাছের কাছাকাছি মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা কাটুই পোকার কীড়া সংগ্রহ করে মেরে ফেলে এ পোকা সহজেই দমন করা যায়। অন্যদিকে ফলের মাছি পোকা মিষ্টি কুমড়ার প্রধান শত্রু। এদের আক্রমণে ৫০-৭০ ভাগ ফল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সেক্স ফেরোমন ট্রেপ ও বিষটোপ ফাদ ব্যবহার করে সহজেই এদের দমন করা যায়। কুমড়া বা শসা থেতলিয়ে তাতে প্রতি ১০০ গ্রামের সাথে ১৫-২০ ফোটা ডিপটারেক্স ৫০ইসি বা নগস ০.৫ মিলি বা ডিডিভিপি ১০০ মিলি পানিতে মিশিয়ে যে কোনো পাত্র বা কলার খোলে আক্রান্ত ক্ষেতের বিভিন্ন স্থানে তিনটি খুটির সাহায্যে ০.৫ মিটার উচুতে রেখে দিলে তা খেয়ে ফলের মাছি পোকা মারা যায়। ২-৩ দিন পরপর নতুন বিষটোপ দিতে হবে।

চারা অবস্থায় গোড়াপচা রোগ, পরিপক্ক অবস্থায় ভাইরাস ও পাউডারী মিলডিউ মিষ্টিকুমড়ার প্রধান রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম। গোড়া পচা রোগ দমনের জন্য অটোস্টিন ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ৫-৭ দিন অন্তর ২-৩ বার গাছের গোড়ায় স্প্রে করতে হবে। ভাইরাস আক্রান্ত গাছ দ্রুত উপড়ে ফেলতে হবে এবং দূরো পুতে ফেলতে হবে। পাউডারী মিলডিই রোগের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম থিওভিট বা কুপ্রাভিট ২ মিলি হিসেবে ১০-১২ দিন পর পর প্রয়োগ করে এ রোগ দমন করা যেতে পারে।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.