- Advertisement -

মাঠ পর্যায়ে গুণগত সার চেনার উপায়

ভেজাল সার চেনার উপায়

395

- Advertisement -

 

মাঠ পর্যায়ে গুণগত সার চেনার উপায়

কৃষিবিদ মোহাইমিন

ভেজাল এখন সব জায়গায়। রাসায়নিক সারও এর আওতামুক্ত হতে পারেনি। মুনাফালোভী অস্বাদু ব্যবসায়ীরা সারে ভেজাল দিয়ে থাকে। রাসায়নিক সারের ব্যাপক চাহিদা ধাকার কারণে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা লাভের জন্য ভেজাল সার উৎপাদন এবং আমদানিকৃত সারে ভেজাল মিশ্রিত করে তা বাজারজাত করে থাকে। এর ফলে কৃষক ভাইয়েরা প্রতারিত হয়ে আসছেন। সঠিক মাত্রায় সার ব্যবহার করেও কাক্সিক্ষত ফলন পান না। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে জমির উর্বতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং উৎপাদন ক্ষমতা ক্রমান্নয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তাই কৃষক ভাইয়েরা যদি গুণগত সার চেনার বা শনাক্ত করার কৌশল জানতে পারেন, তাহলে ভেজাল সারের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে পারেন। নিচে ভোজাল সার চেনার কিছু কৌশল বর্ণনা করা হল।

ইউরিয়া
দেশে উৎপাদিত এবং আমদানি করা ইউরিয়া সারে সাধারণত ভেজাল পরিলক্ষিত হয় না। তবে ডোলোমায়িট বা সস্তা রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে ছোট দানা তৈরি করে ইউরিয়ার দানার সঙ্গে ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত করলে রঙ দেখে তা শনাক্ত করা যাবে। আসল ইউরিয়া সার কোনো অবস্থাতেই স্ফটিক আকৃতির হবে না। ইহা দানাদার বা প্রিল্ড (ক্ষুদ দানাদার) হিসেবে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। ইহা সহজেই পানিতে গলে যায়। এক চা চামুচ ইউরিয়া আধা গ্লাস পানিতে ঢেলে চামিচ দিয়ে নাড়াচাড়া করলে তাৎক্ষণিকভাবে গলে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈরি হবে। এ দ্রবণে হাত দিলে বেশ ঠান্ডা অনুভূত হবে। আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো কিছু ইউরিয়া খোলা পাত্রে রাখলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে। এতে প্রমাণিত হবে যে ইউরিয়ার নমুনাটিতে কোনো ভেজাল নেই।

টিএসপি
টিএসপিতে অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সার পানিতে সহজেই দ্রবণীয়। এক চা চামুচ টিএসপি পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে ডাবের পানির মতো দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল টিএসপি পানিতে মিশালে ঘোলা দ্রবণ তেরি হবে। এফএমপি দানা এবং কাঁদা মাটি, জিপসাম ও ডলোমাইট দিয়ে তৈরি দানা যদি ভেজাল হিসাবে টিএসপিতৈ মিশানে হয় তা তলানি আকারে গ্লাসের নিচে জমা হবে। প্রকৃত টিএসপি অধিক শক্ত বিধায় দুটো বুড়ো নখের মাঝে রেখে চাপ দিলে সহজে ভেঙ্গে যাবে না, কিন্তু ভেজাল টিএসপি অপেক্ষাকৃত নরম হওয়ায় সহজে ভেঙে যাবে। ভেজাল টিএসপি সারের ভাঙার ভেতরের অংশের রঙ বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এফএমপির দানা যদি ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত তা সহজে ভাঙবে না এবং পানিতেও গলবে না।

ডিএপি
ডিএপি সারেও টিএসপি সারের মতো অম্লস্বাদযুক্ত ঝাঁঝালো গন্ধ থাকে। এ সারও সহজেই পানিতে গলে যায়। প্রকৃত ডিএপি সারে নাইট্রোজেন বিদ্যমান থাকায় বাহিরে একটি কাগজে খোলা অবস্থায় কিছু দানা রাখলে তা বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে কিছুক্ষণের মধ্যে ভিজে উঠবে। এক চা চামুচ ডিএপি সারের সঙ্গে খাবার চুন মিশিয়ে কষা দিলে এমোনিয়ার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ বের হলে বুঝা যাবে সারটি প্রকৃত ডিএপি। আর একটি সহজ পরীক্ষা হলো এক চা চামুচ ডিএপি সার আধা গ্লাস পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে গিয়ে স্বচ্ছ দ্রবণ তৈয়ার হবে, পক্ষান্তরে গন্ধক জাতীয় কোনো পদার্থ ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকলে ঘোলা দ্রবণ তৈরি হবে।

এমওপি
এমওপি সারে ঝাঁঝালো গন্ধ নেই, তবে জিবে দিলে ঝাঁঝালো স্বাদ পাওয়া যায়। বর্ষা কালে খোলা অবস্থায় রেখে দিলে বাতাস থেকে আর্দ্রতা শোষণ করে ভিজে উঠবে এবং ক্রমান্বয়ে সারে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। আধা চা চামচ এমওপি সার গ্লাসের পানিতে মিশালে তাৎক্ষণিকভাবে গলে পরিষ্কার দ্রবণ তৈরি হবে, পক্ষান্তরে ভেজাল এমওপি পানিতে মিশালে অদ্রবণীয় বস্তু যেমন বালি, কাচের গুঁড়া, ক্ষুদ্র সাধা পাথর, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি তলানি আকারে নিচে জমা হবে। আসল এমওপি সারের ক্ষেত্রে গ্লাসে হাত দিলে ঠা-া অনুভূত হবে, নকল সারে কম ঠা-া অনুভূত হবে। সারে যদি ভেজাল হিসেবে লাল বা অন্য কোনো রঙ মিশ্রিত থাকে, পানির রঙ সেই অনুযায়ী হবে এবং রঙ ভেসে উঠবে। এছাড়া দ্রবণে হাত দিলে রঙ লেগে যাবে।

জিপসাম
একটি কাচের বা চীনা মাটির পাত্রে এক চা চামচ জিপসাম সারের উপর ১০ ফোঁটা পাতলা (১০%) হাইড্রোক্লোরিক এসিড মিশালে যদি বুঁদ বুঁদ দেখা যায় তবে ধরে নেয়া যাবে যে জিপসাম সারটি ভেজাল। কখনও কখনও চুনের গুঁড়া ও মাটির গুঁড়া মিশিয়ে ভেজাল জিপসাম তৈরি করা হয়।

জিংক সালফেট সার
প্রকৃত জিংক সালফেট (মনোহাইড্রেট) সার দেখতে রঙবিহীন ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির। ইহা দানাদার হিসেবেও বাজারজাত করা হয়। সহজ পরীক্ষার জন্য এক চা চামচ সার আধা গ্লাস পানিতে দ্রবীভূত করলে তা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং দ্রবণটি ঘোলাটে হবে। যদি নমুনাটি সঠিক জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে গাঢ় ঘোলা দ্রবণটি ধীরে ধীরে গ্লাসের নিচ থেকে উপরের দিকে পরিষ্কার হতে থাকবে। যদি নমুনাটি ভেজাল জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট) হয়, তাহলে কিছুক্ষণ পর গাঢ় ঘোলাটে দ্রবণটির উপরের অংশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গ্লাসের নিচের দিকে নামতে থাকবে। আসল জিংক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার দেখতে সাদা ক্ষুদ্রাকার স্ফটিক আকৃতির । এক চা চামচ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) আধা গ্লাস পানিতে মিশালে সারটি সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনরূপ তলানি পড়বে না। একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়। একই পরিমাণ জিঙ্ক সালফেট (হেপটাহাইড্রেট) সার জিঙ্ক সালফেট (মোনোহাইড্রেট সারের তুলনায় ওজনে অনেক হালকা হয়।

বোরন সার
বরিক এসিডের রঙ সাদা। ইহা অনিয়তিকার এবং স্ফটিক আকৃতির হয়। হাতে কিছু পরিমাণ বরিক এসিড নিয়ে আঙুল দিয়ে ঘষা দিতে থাকলে এক পর্যায়ে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে। কিন্তু ভেজাল বরিক এসিডে পিচ্ছিল তেলতেলে ভাব অনুভূত হবে না। এক চা চামচ বরিক এসিড এক গ্লাস গরম পানিতে মিশালে উহা সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং গ্লাসের তলায় কোনো প্রকার তলানি পড়বে না। সল্যুবর বোরন দেখতে ধবধবে সাদা, হালকা, মিহি পাউডারের মতো। এক চা চামচ সল্যুবর গ্লাসে ঠা-া পানিতে দ্রবীভূত করলে প্রকৃত সল্যুবর বোরন সার সম্পূর্ণ গলে যাবে এবং পাত্রে কোনো প্রকার তলানি পড়বে না। এ দ্রবণে এক চিমটি বেরিয়াম ক্লোরাইড মেশালে দ্রবণে কোনো অধঃক্ষেপ পড়বে না। যদি নমুনাটিতে সোডিয়াম সালফেট ভেজাল হিসেবে মিশ্রিত থাকে তাহলে বেরিয়াম সালফেটে অধঃক্ষেপ পড়বে এবং দ্রবণটি তাৎক্ষণিকভাবে দুধের মতো সাদা হয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: এসআরডিআই, বাংলাদেশ।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.