- Advertisement -

ভাদ্র মাসের কৃষি

বারো মাসের কৃষি

384

- Advertisement -

 

ভাদ্র মাসের কৃষিতে আপনার যা করণীয়

কৃষিবিদ মোহাইমিন

বর্ষাকালের পরেই আসে শরৎকাল। শরৎকালের প্রথম মাস ভাদ্র। মাঠে ময়দানে, নদী নালা, খাল বিল সবখানেই পানির অথৈ খেলা। সবুজ মাঠ, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। শরতের সকালটাও অসাধারণ। সবুজ ঘাসের উপর শিশির বিন্দু জমতে শুরু হয়। মোদ্দাকথা ভাদ্র মাস মন ভালো করার মত মাস। কৃষক ভাইয়েরা মনোমুগ্ধকর এই মাসে কৃষির ভুবনে কি আছে চলুন একটু জেনে নেই।

মাঠে এখন আর আউশ ধান থাকার কথা নয়। তারপরও যদি মাঠে আউশ ধান থাকে, দেরি না করে কেটে, মাড়াই ও ঝাড়াই করে ঘরে তুলে নিতে হবে।

আমন ধান রোপণ প্রায় শেষ পর্যায়। স্বাভাবিক সময়ে চারা রোপণ করলে, রোপা আমন ধান এখন বাড়ন্ত পর্যায়ে। এ সময় মাঠে আগাছা হতে পারে। তাই আগাছা দমনের ব্যবস্থা নিন। ১৫ থেকে ২০ দিন বয়সের রোপণকৃত ধানক্ষেতে প্রথম কিস্তি এবং ৩০ থেকে ৪০ দিনের রোপণকৃত ধানক্ষেতে দ্বিতীয় কিস্তির ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সারের তৃতীয় কিস্তি চারা রোপণের ৫০ থেকে ৬০ দিন পর প্রয়োগ করতে হবে।

বন্যার কারণে যাদের বীজতলা নষ্ট হয়েছে, তারা এখনই বীজতলায় নাবি জাতের চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা নিন। ভাদ্র মাস পর্যন্ত অনায়সে নাবি জাতের চারা রোপণ করা যায়। বয়স্ক চারার ক্ষেত্রে গুছিতে ৫ থেকে ৭ টি চারা দিয়ে রোপণ করতে পারেন। নাবি জাত রোপণের জন্য বিআর২২ বিআর২৩, ব্রি ধান৩৮, ব্রি ধান৪৬,  বিনাশাইল, নাইজারশাইল বা স্থানীয় উন্নত শাইল ধান বেশ উপযোগী। দেরিতে চারা রোপণের বেলায় প্রতি গুছিতে ৫ থেকে ৭টি চারা দিয়ে ঘন করে রোপণ করতে হবে।

রোপা আমনের জমিতে এই সময়ে মাজরা, পাতামোড়ানো, পামরি, চুঙ্গি, গলমাছি পোকার আক্রমণ হতে পারে। তাছাড়া পাতায় দাগ রোগ ও পাতা পোড়া রোগ দেখা দিতে পারে। রোগ ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত জমি পরিদর্শন করতে হবে। পোকার উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য নিয়মিত আলোক ফাঁদের ব্যবস্থা নিতে হবে। জমিতে খুঁটি দিয়ে, পোকার ডিমের মাদা সংগ্রহ করে, আলোক ফাঁদ পেতে, হাতজাল দিয়ে পোকা ধরে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এছাড়াও সঠিক বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় সঠিক সময়ে স্প্রে করতে পারেন। বালাইনাশক ব্যবহারের সময় বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

পাটের বীজ উৎপাদনের জন্য এই সময়ে পাট বীজ বপন করতে পারেন। সুনিষ্কাশিত উঁচু জমিতে শতক প্রতি ১০ থেকে ১৬ গ্রাম বীজ বপন করতে হবে।

এ সময়ে আখ ফসলের লালপচা রোগ দেখা দিতে পারে। এটা ছত্রাকজণিত রোগ। লালপচা রোগ দেখা দিলে আখের কান্ড পঁচে যায় এবং পাতা হলদে হয়ে শুকিয়ে যেতে থাকে। আক্রান্ত আখ জমি থেকে তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। জমিতে পানি জমে থাকা যাবে না। প্রয়োজনীয় নিকাশের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পানির মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার ঘটায়। প্রয়োজনে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে।

ভাদ্র মাসে লতানো সবজি চাষ করা যায়। যেমন লাউ ও শিমের বীজ বপন করতে পারেন। প্রয়োজনে ছোট পলিব্যাগে চারা উৎপাদন করতে পারেন। এজন্য ৪ থেকে ৫ মিটার দূরে দূরে ৭৫ সে.মি চওড়া এবং ৬০ সে.মি গভীর করে মাদা বা গর্ত করতে হবে। তারপর প্রতি মাদায় ২০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৭৫ গ্রাম এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। মাদা তৈরি হলে প্রতি মাদায় ৪ থেকে ৫টি বীজ বুনে দিতে হবে এবং চারা গজানোর ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর দু‘তিন কিস্তিতে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৭৫ গ্রাম এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। তাছাড়া এ সময়ে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, ওলকপি, বেগুন ও মরিচের চারা উৎপাদন শুরু করতে পারেন। আবার লাইশাক,লালশাক, পালংশাক, মূলা এবং ধনেপাতার বীজ বপন করতে পারেন।

এ সময় থেকে আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করতে পারেন। আগাম সবজির চারা মাচায় বীজতলা তৈরি করতে পারেন। সবজির চারা উৎপাদনের জন্য উঁচু এবং আলো বাতাসযুক্ত জায়গা নির্বাচন করতে হবে। জমি ভালোভাবে কুপিয়ে বা চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করুন। বীজতলার মাটি শোধন করে নিন। চাষের সময় এক বর্গমিটার জমির জন্য ১০ কেজি জৈব সার এবং ৩০০ গ্রাম টিএসপি সার মাটির সাথে ভালো ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। জমি তৈরি হয়ে গেলে এক মিটার চওড়া করে এবং জমির দৈর্ঘ্য অনুসারে লম্বা করে বেড তৈরি করতে পারেন। দু’টি বেডের মাঝখানে ৬০ সে.মি. ফাঁকা রাখতে হবে, ফাঁকা স্থানের মাটি কোদাল দিয়ে দু’বেডে উঠিয়ে দিতে হবে। এতে যে নালা তৈরি হবে তার গভীরতা হবে ১৫ সেন্টিমিটার।
বীজশোধন ও বীজতলার মাটি শোধন অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় কাজ।

বীজতলা তৈরি হয়ে গেলে আপনি বীজ বুনতে পারেন। মাটির এক থেকে দেড় সে.মি. গভীরে বীজ বপন করতে হবে। প্রতি বর্গমিটার জায়গার জন্য যদি ফুলকপির বীজ বপন করেন তবে ৪০-৫০ গ্রাম, বাঁধাকপির বীজ বপন করতে চাইলে ৫০-৬০ গ্রাম, বেগুনের বীজ ৮০-১০০ গ্রাম, টমেটোর বীজ ৮০-১০০ গ্রাম বপন করতে পারেন। বীজ বোনার পর বেডগুলো চাটাই বা পলিশিটের ছাউনি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। চারা গজানোর পর সকালে এবং বিকেলে হালকা রোদ যাতে লাগতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। চারার শিকড় শক্ত হলে এবং আসল পাতা মেলতে শুরু করলে রোদ কোনো ক্ষতি করতে পারে না। বরং এ সময় রোদ বেশ উপকারে লাগে। চারা গজানোর আগে এবং পরে বৃষ্টি থেকে চারা রক্ষা করতে হবে। এ জন্য পলিথিনের ছাউনি বেশ কার্যকর। চারা একটু বড় হলে ইউরিয়া এবং এমওপি সার দেয়া যেতে পারে। তবে এ সার দুটো মাটিতে না দিয়ে সেচের পানির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া ভালো। সেচের পানির সংগে মিশিয়ে দিলে প্রতি লিটার পানিতে সার দুটোর ১-২ গ্রাম করে গুলে ঝাঝরি দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। বীজতলায় চারা ঘন হয়ে গেলে কিছুটা পাতলা করে দিতে হবে। এরপর রোপণের উপযুক্ত হলে দেরি না করে সবজির চারা রোপণ করতে হবে। সাধারণত সবজির চারার বয়স ২৫-৩০ দিন হলে রোপণের উপযোগী হয়। এ মাসের শেষের দিকে চারা উৎপাদনের পাশাপাশি মূলজমিতে কাজ করা শুরু করতে হবে।

ভাদ্র মাসেও ফল এবং ওষধি গাছের চারা লাগানো যায়। এ বছর রোপণ করা চারার গোড়ায় মাটি দেয়া, চারার অতিরিক্ত এবং রোগাক্রান্ত ডাল ছেঁটে দেয়া, বেড়া বা খাঁচা এবং খুঁটি দেয়া, মরা চারা তুলে নতুন চারা রোপণসহ অন্যান্য পরিচর্যা সময়মত নিয়মতান্ত্রিকভাবে করতে হবে। ভাদ্র মাসে আম, কাঁঠাল এবং লিচু গাছের ডালপালা ছেঁটে দিতে হয়। ফলের বোঁটা, গাছের ছোট ডালপালা, রোগাক্রান্ত অংশ ছেঁটে দিলে পরের মৌসুমে বেশি করে ফল ধরে। এতে ফলগাছে রোগ ও পোকামাকড় কম হয়।
গো-খাদ্যের জন্য রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে বা পতিত জায়গায় খেসারি, মুগ, মাসকলাই, ভূট্টা এসব ফসলের বীজ বুনতে পারেন। বর্ষায় গোয়াল ঘর, হাঁস-মুরগির ঘরের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা সংস্কার করতে পারেন। গবাদিপশুর রোগবালাই সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। এ সময় হাঁস-মুগির বাচ্চা ফুটাতে পারেন। নিয়মিত টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সুষম হারে খাবার দিতে হবে।

বর্ষায় ক্ষতি হওয়া পুকুর পাড় মেরামত করতে হবে। পুকুর পাড়ে আম্রপালি, ডালিম, লেবু, করমচা, পেয়ারা, জামরুল জাতীয় ফলের গাছ লাগাতে পারেন। পুকুরে নতুন মাছ ছাড়তে চাইলে এখনই ছাড়তে পারেন। মাছ ছাড়ার আগে পুকুরের জলজ আগাছা পরিস্কার করে নিতে হবে। এসময় পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিতে পারেন। রোগের নিরাময়ে ব্যবস্থা নিন।

 

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.