- Advertisement -

বৈশাখ মাসের কৃষি

বারো মাসের কৃষি

1,462

- Advertisement -

 

বৈশাখ মাসের কৃষি

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

শুভ বাংলা নববর্ষ । ষড়ঋতুর প্রথম ঋতু গ্রীষ্ম। গ্রাম বাংলার সংস্কৃতিমনা মানুষ বৈশাখী মেলায় মেতে উঠে। মেতে উঠে বিভিন্ন পার্বন, উৎসব, আদর আপ্যায়নে এবং অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন বোরো ধান কেটে ঘরে তোলার।
বোরো ধান শতকরা ৮০ ভাগ পেকে যাওয়ার সাথে সাথেই ফসল কেটে মাড়াই করে ঘরে তুলে নিতে হবে। হাওড় এলাকায় ইতোমধ্যে বোরো ধান কর্তনের উৎসব শুরু হয়ে গেছে। যত দ্রুত সম্ভব পাকা ধান কেটে মাড়াই করে নিন। সম্ভব হলে যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ধান কাটা ও মাড়াই কার্যাদি সম্পন্ন করতে হবে।

নাবিতে রোপনকৃত উফশী বোরো ধানের বেলায় শীষ বের হওয়া থেকে দানা পুষ্ট হওয়া পর্যন্ত জমিতে পর্যাপ্ত পরিমান পানি ধরে রাখতে হবে। রাতের তাপমাত্রা ১৮-২০০ সে. হলে শীষ বের হতে সময় লাগে বা বাধাগ্রস্থ হয় এবং ধান চিটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ৩৫০ সে. এর বেশি উচ্চ তাপমাত্রা যদি এক ঘন্টা সময় গাছের ফুলফোটা অবস্থায় বিরাজ করে তা হলেও ধান চিটা হতে পারে। প্রতিকার হিসেবে জমিতে ৫-১০ সেমি. পানি ধরে রাখতে হবে। সম্ভব হলে সেচের পানি বারবার পরিবর্তন করতে হবে। নাবিতে রোপনকৃত বোরো ধানে মাজরা পোকা, গান্ধি পোকা, বাদামি এবং সাদাপিঠ গাছ ফড়িং ও ইঁদুর ধানের উল্লে¬খযোগ্য ক্ষতি করে থাকে। আলোর ফাঁদের ব্যবহার, জমিতে ডালপালা পুঁতে দেওয়া, ডিমের গাদা সংগ্রহ করে নষ্ট করা, নিয়মিতভাবে ধান গাছের গোড়ায় বাদামী এবং সাদাপিঠ গাছফড়িংয়ের আক্রমণ পর্যবেক্ষণ করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সকল পোকার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। বাদামি গাছ ফড়িং নিয়ন্ত্রনের জন্য এসময় জমিতে হাঁস ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ এ সময় হাঁস জমির ধানের ছড়া ভেঙ্গে ক্ষতি করতে পারে। ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ ও বিষটোপ ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করতে হবে। ইদুর নিধনে মাঠের সকল কৃষক মিলে একযোগে ব্যবস্থা নিলে অধিক সুফল পাওয়া যাবে।

পাতা ঝলসানো, খোল পোড়া ও শীষের গিট ব্লাস্ট রোগ ধানের অনেক ক্ষতি করে। মেঘলা আবহাওয়া, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি, তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সে. এর নিচে বিরাজ করলে ব্যাপক ভাবে শীষের গিট ব্লাস্ট আক্রমণ করতে পারে। তাছাড়া শেষ রাতে প্রচন্ড ঠান্ডা আবার দিনে গরম এই আবহাওয়া ব্লাস্ট রোগের জন্য অনুকুলে।  ব্লাস্ট রোগে ও খোল পোড়া রোগের আক্রমণ বেশি হলে অনুমোদিত মাত্রায় ছত্রাকনাশক আক্রান্ত এলাকায় প্রয়োগ করতে হবে। পাতা ঝলসানো রোগের আক্রমণ বেশি হলে বিঘা প্রতি ৫ কেজি পটাশ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

গম এবং ভূট্টা এ দু’টো দানাদার ফসল ইতোমধ্যে হয়তো কর্তনের পর বাড়ির আঙ্গিনায় চলে এসেছে। ভালভাবে শুকিয়ে খাবার গম এবং বীজের জন্য গম আলাদা ভাবে সংরক্ষন করতে হবে। পরবর্তী মৌসুমের বীজ সংরক্ষণের দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে বীজ শুকানো, পাত্রে সংরক্ষণ, পাত্র বায়ু রোধ করা, পাত্রটি মাটির হলে আলকাতরার প্রলেপ দেয়া, পাত্রটিকে মাটি থেকে আলাদা রাখা। এখন যদি বীজ ভালভাবে সংরক্ষণ করা যায় তবে আগামী মৌসুমে উৎকৃষ্ট ও মানসম্মত বীজের নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বীজ বিক্রি করে অতিরিক্ত লাভও করা যাবে। খরিফ মৌসুমে বোনা ভূট্টার বয়স ২০-২৫ দিন গলে ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে হাল্কা সেচ দিতে হবে। প্রথমবার উপরি প্রয়োগের পর গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিতে হবে।

বৈশাখ মাস তোষা পাট বোনার উপযুক্ত সময়। ও-৪ বা ফাল্গুনী তোষা ভালো জাত। বীজ বপনের আগে প্রতি কেজি বীজে ৪ গ্রাম ভিটাভেক্স বা ১৫০ গ্রাম রসুন পিষে বীজের সাথে মিশিয়ে শুকিয়ে পরে জমিতে বপন করা হলে বালাইয়ের আক্রমণ কম হয়। পাট সারিতে বুনলে বীজের পরিমান কম লাগে। জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার ব্যবহার করা হলে রাসায়নিক সারের পরিমাণ যেমন কম লাগে তেমনি পাটের ফলনও ভালো পাওয়া যায়।

এই সময়ে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির বীজ বপন বা রোপণ করতে পারেন। ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, শসা, পটল, কাকরল, করলাসহ অন্যান্য সবজির জন্য মাদা তৈরি করতে হবে। ১ হাত দৈর্ঘ্য এবং ১ হাত চওড়া মাদা করে পরিমাণমত জৈবসার বা গোবর সার, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গাম এমওপি ভালাভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে ৫-৭ দিন রেখে দিতে হবে। তার পর পানিতে ভেজানো মানসম্মত বীজ মাদাপ্রতি ৩-৫ টি রোপণ করতে হবে। চারা যদি আগে তৈরি করা থাকে তবে ৩০-৩৫ দিন বয়সের সুস্থ সবল চারা রোপণ করতে পারেন। গ্রীষ্মকালীন সবজির অধিকাংশই লতানো সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মাচা তৈরি করে নিতে হবে। বাঁশ, নাইলন দড়ি, তার দিয়ে মাচা তৈরি করা যায়। মনে রাখবেন লতানো সবজি গাছ যদি বেশি বৃদ্ধি পায়, তবে তার ফুল ফল ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। সেজন্য বেশি বৃদ্ধিসম্পন্ন লতার বা গাছের কিছু ডালপাতা কেটে দিতে হবে, তাতে ফুল ফল বেশি ধরবে।

কুমড়া জাতীয় যে সব সবজি আছে তাতে হাত-পরাগায়ন বা কৃত্রিম পরাগায়ন ঘটাতে হবে। সেজন্য ফুল ধরা শুরু হলে প্রতিদিন পরাগায়ন করলে তাতে ফলন বেশ ভালো হবে। কুমড়া জাতীয় ফসলে মাছি পোকা বেশ ক্ষতি করে। এজন্য জমিতে খুঁটি পুঁতে খুঁটির মাথায় বিষটোপ ফাঁদ দিলে বেশ উপকার হয়। একশত গ্রাম পাকা থেঁতলানো মিষ্টি কুমড়া বা অন্য যে কোন সুগন্ধি পাকা ফলের সাথে আধা গ্রাম সেভিন বা ডিপটারেক্স-৮০ বা আধা মিলি ডিডিভিপি , বা ১০ ফোঁটা ডারসবান মিশাতে হবে। মাছি পোকা আকৃষ্ট হবে এবং পরে মারা যাবে। বিষটোপ ২ দিন পর পর বদলাতে হবে। শাক সবজি জমির আগাছা পরিস্কার, সার প্রয়োগ সেচ নিকাশ বিশেষ করে পানি যেন না জমতে পারে সে দিকে সতর্ক থাকতে হবে। গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করতে চাইলে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে বারি টমেটো-৪, বারি টমেটো-৫, বারি টমেটো-৬, বারি টমেটো-১০, বারি টমেটো-১১ বা বিনা টমেটো- ১, বিনা টমেটো -২ এর চাষ করতে পারেন। একটু বেশি যতœ এবং পরিচর্যা করলে অভাবনীয় ফলাফল পাওয়া যায়। পুঁইশাক, কলমীশাক পরিকল্পিতভাবে চাষ করতে পারলে মৌসুমে ১০-১২ বার কাটা যায়। শাক জাতীয় ফসলের জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ভালো ফলনের নিশ্চয়তা এনে দেয়।

ভালা ফলনের জন্য এ সময় বৃক্ষ জাতীয় গাছের বিশেষ করে ফল গাছের প্রয়োজনীয় যতœ নিতে হবে। মাতৃগাছের পরিচর্যা, আগাছা দমন, প্রয়োজনীয় সেচ দেয়া হলে এর ফল কিছুদিন পরেই পাওয়া যাবে। আমের মাছি পোকা বা অন্যান্য পোকা-মাকড়ের জন্য সতর্ক থাকতে হবে। আসছে মৌসুমে যদি গাছ লাগাতে চান তবে এখন থেকেই জায়গা নির্বাচন, পকিল্পনা, জমির নকশা, এসব প্রাথমিক কাজ এখন থেকে শুরু করতে পারেন।

গরমকালে মুরগি পালনে যেসব সমস্যা দেখা দেয় তাহলো খাদ্য গ্রহণ, ব্রয়লারের দৈহিক ওজন বৃদ্ধির হার, লেয়ার ও ব্রিডারের ডিম উৎপাদনসহ ডিমের খোসার গুণগতমান কমে যায় এবং খামারে মুরগি মারা যাওয়ার হার বেড়ে যায়। সে কারণে ব্রুডার হাউসের শেডে বাচ্চা তোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি ও গ্লুকোজ খাওয়াতে হবে। আর লেয়ার হাউস ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শেডের চাল বা ছাদে তাপ বিকিরণ করতে পারে এমন সাদা, অ্যালুমিনিয়িাম রঙ দেয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত গরমে পাইপ বা ঝরনার মাধ্যমে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র খামারের ক্ষেত্রে চালের ওপরে পাটের চট দিয়ে পানি ছিটাতে হবে। প্রচন্ড গরমে খাবারের পানির সঙ্গে বরফ মেশানো দরকার।

হাঁস মুরগির রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া জরুরী। সেজন্য মুরগির রানীক্ষেত, ব্রংকাইটিস, ফাউলপক্ষ, ফাউল কলেরা, ম্যারেক্স এবং হাঁসের প্লেগ ও কলেরা রোগের টিকা দেয়ার জন্য উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

গোখাদ্যের জন্য নেপিয়ার, বাজরা, প্যারা, ভুট্টা, ইপিল ইপিল এর চাষ করার ভালো সময় এখন। বাড়ির আশপাশে, পুকুর পাড়ে, রাস্তার ধারে, পতিত জায়গায় গোখাদ্যের চাষ করে লাভবান হওয়া যায়। গ্রীষ্মের তাপদাহে গবাদি পশুর জন্য অতিরিক্ত খাবার, বিশ্রাম, ঘরে আলো বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, বেশি পানি খাওয়ানোসহ অন্যান্য কার্যক্রম সঠিকভাবে করতে হবে। এ সময় গবাদি পশুর তড়কা ও গলাফুলা রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য টিকা প্রদানসহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

বৈশাখ মাস পুকুরে মাছ ছাড়ার উপযুক্ত সময়। ভালোভাবে পুকুর তৈরি করে অর্থাৎ সেচে কাদা সরিয়ে, চুন প্রয়োগ করে, আগাছা পরিস্কার, পানি দেয়া, পানি পরীক্ষা, পুকুর পাড়ে পাতা ঝরা গাছ ছাঁটাই বা কেটে ফেলাসহ অন্যান্য কাজ করে নিতে হবে। এসব প্রাসঙ্গিক কাজগুলো শেষ করে বিশ্বস্থ্য উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করে মাছ চাষের ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রিয় পাঠক, বৈশাখ আসে আমাদের জন্য নতুন আবাহনের সৌরভ নিয়ে। সঙ্গে আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসে কালবৈশাখীকে। কালবৈশাখীর থাবা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কৃষিতে আগাম বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সুবিবেচিত লাগসই কৌশল আর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সব বাধা ডিঙিয়ে আমরা কৃষিকে নিয়ে যেতে পারব সমৃদ্ধির ভূবনে।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.