- Advertisement -

 বিটি বেগুন পরিচিতি ও উৎপাদন কৌশল

পরিবেশবান্ধব কৃষি

2,118

- Advertisement -

 

 বিটি বেগুন পরিচিতি ও উৎপাদন কৌশল

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

বাংলাদেশে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে চাহিদা, উৎপাদন ও ভোক্তা প্রিয়তার শীর্ষে থাকা প্রধান চারটি সবজির মধ্যে বেগুন অন্যতম একটি সবজি। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রাায় সব জেলাতেই বেগুন চাষ হয়ে থাকবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ বেগুনে অনেক পুষ্টিগুণ রয়েছে। বেগুন রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে থাকে । কম ক্যালোরি যুক্ত খাবার বলে বেগুন শরীরের ওজন কমাতেও সাহায্য করে। বেগুন উৎপাদনের প্রধান অন্তরায় হলো ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা। বাংলাদেশের কৃষকরা বেগুন উৎপাদনে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী শত্রু পোকা দমনের জন্য এক মৌসুমে ১৬০-১৮০ বার স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কীটনাশক প্রয়োগ করে। ফলশ্রুতিতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে অন্য দিকে ফসল উৎপাদনের খরচও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিরায়ত প্রজনন পদ্ধতির মাধ্যমে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব না হওয়ায় উন্নত বিশ্বে আবিষ্কৃত কাক্সিক্ষত বৈশিষ্ট্যের জিন (Cry I Ac) বাংলাদেশী ৯টি জাতে সংযোজন করে বিটি বেগুন নামে ৯টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর, ২০১৩ সালে বিটি বেগুন অবমুক্ত করার ফলে বাংলাদেশ জিএম ফসল চাষের ২৯ তম দেশ হিসাবে পরিগণিত হয়।

বিটি বেগুনের প্রধান সুবিধা: বেগুনের প্রধান ক্ষতিকর পোকা ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পেকার আক্রমণ থেকে বেগুনকে রক্ষা করে। উদ্ভাবিত বিটি বেগুনের জাত গুলো হাইব্রিড না হওয়ায় নিজেদের বীজ কৃষকরা নিজেরাই উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবে। কোনো একক বীজ কোম্পানির কাছে প্রতি বছর বীজ কেনার জন্য দ্বারস্থ হতে হবে না, কৃষকের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। সর্বোপরি কৃষক তাদের কাঙ্খিত উৎপাদন বৃদ্ধিসহ আয় বৃদ্ধি করতে পারবে।

জলবায়ু ও মাটি: আমাদের দেশের সব রকমের মাটিতে বেগুন চাষ করা যায় এবং ভালো ফলনও দিয়ে থাকে। তবে পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। বেলে দোআঁশ বা দোআঁশ মাটি এর চাষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট। বেগুনের জন্য ১৫ ডিগ্রি থেকে ২০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা সবচেয়ে উপযোগী। উচ্চ তাপমাত্রায় বেগুনের ফুলও ফল উৎপাদন বিঘ্নিত হয় এবং এ সময় অনিষ্টকারী পোকা বিশেষ করে ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ বেশি হয়।

জাত: বারি বিটি বেগুন-১ (উত্তরা), বারি বিটি বেগুন-২ (কাজলা), বারি বিটি বেগুন-৩ (নয়নতারা), বাটি বিটি বেগুন -৪ (ঈশ্বরদী-০০৬) নামে চারটি জাত চাষি পর্যায়ে চাষের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। জাত গুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হলো-

বারি বিটি বেগুন-১ জাতটি গাছের বৃদ্ধির ধরণ ছড়ানো, সাধারণত ৭০ থেকে ৮০ সেমি উচু হয়, গুচ্ছাকারে ফল ধরে থাকে, ফলের বোটার রং বাদামী, ফলের আকার আকৃতি উপবৃত্তাকার, ফলের রং গোলাপী, প্রতি ফলের ওজন ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম এবং হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ টন।

বারি বিটি বেগুন-২ জাতটি গাছের বৃদ্ধির ধরণ ছড়ানো, সাধারণত ৬৫ থেকে ৭৫ সেমি উচু হয়, গুচ্ছাকারে ফল ধরে থাকে, ফলের বোটার রং বাদামী, ফলের আকার আকৃতি সিলিন্ডারাকৃতি, ফলের রং কালচে বেগুনী, প্রতি ফলের ওজন ৭৫ থেকে ৮৫ গ্রাম এবং হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ টন।

বারি বিটি বেগুন-৩ জাতটি গাছের বৃদ্ধির ধরণ মধ্যম খাড়া, সাধারণত ১১০ থেকে ২২০ সেমি উচু হয়, এককারে ফল ধরে থাকে, ফলের বোটার রং সবুজাভ বাদামী, ফলের আকার আক গোল, ফলের রং কালচে বেগুনী, প্রতি ফলের ওজন ১২০ থেকে ১৩০ গ্রাম এবং হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ টন।

বারি বিটি বেগুন-৪ জাতটি গাছের বৃদ্ধির ধরণ মধ্যম খাড়া, সাধারণত ১০০ থেকে ১১০ সেমি উচু হয়, একক ফল ধরে থাকে, ফলের বোটার রং বাদামী, ফলের আকার আকৃতি ডিম্বাকৃতি, ফলের রং কালচে সবুজ, প্রতি ফলের ওজন ২০০ থেকে ২৩০ গ্রাম এবং হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ টন।

জীবন কাল: জাতভেদে এসব বেগুনের জীবনকাল ১৫০-১৮৩ দিন হয়ে থাকে।

জমি তৈরি: জমি ৪ থেকে ৫ টি চাষ দিয়ে এমন ভাবে তৈরি করতে হবে জমিতে ঢেলা না থাকে।

সার সুপারিশ: জমি তৈরি শেষ চাষের সময় হেক্টর প্রতি প্রায় ১০-১৫ টিন গোবর সার, ১০০ কেজি পরিমাণ টিএসপি সার, ২০০ কেজি পরিমান পটাশ সার ছিটিয়ে দিয়ে ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।
চারা রোপণ: ৩০-৩৫ দিনে বয়সের চারা রোপণ করা উত্তম। রোপণের দূরত্ব নির্ভর করে জাত ও মাটির উর্বরতার ওপর। সাধারণত ৭০ সেমি. প্রশস্ত বেডে একক সারিতে চারা রোপণ করা হয়। দুইটি বেডের মাঝে ৩০ সেমি. প্রশস্ত নালা থাকে। সারিতে গাছ থেকে গাছ দূরত্ব ৫০-৭০ সেমি. হয়ে থাকে।

সেচ ব্যবস্থা: বেডের দুইপাশের নালা দিয়ে জমিতে সেচ দিয়ো সুবিধাজনক। নালায় সেচের পানি বেশিক্ষণ ধরে রাখা যাবে না, গাছের গোড়া পর্যন্ত মাটি ভিজে গেলে নালায় নানি ছেড়ে দিতে হবে। খরিপ মৌসুমে জমিতে পানি যাতে না জমে সেজন্য পানি নিষ্কাশনের জন্য জমির চারপাশে নালা রাখতে হবে।

ফসল সংগ্রহ: চারা লাগানোর ৫০-৬০ দিন পরই ফসল কাটার সময় হয়। ৭-১০ দিন পরপর গাছ থেকে ধারাল ছুরির সাহায্যে বেগুন কাটা ভালো।

পোকামাকড় ও রোগবালাই: বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা: বিটি বেগুন ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী। তবে বেগুন পাতার হপার পোকা, ইপিল্যাকনা বিটল, লাল মাকড় পোকা আক্রমন করতে পারে সেক্ষেত্রে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাছাড়া কান্ড পচা, ফল পচা (ফমোপসিস ব্লাইট), ঢলে পড়া রোগ, গুচ্ছপাতা রোগ দূরীকরনে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.