- Advertisement -

ফাল্গুন মাসের কৃষি

বারো মাসের কৃষি

485

- Advertisement -

ফাল্গুন মাসের কৃষি

শীতকে বিদায় জানিয়ে বসন্ত শুরু হয় নতুন সাজে।  গাছে গাছে নব পল্লবের সবুজ আভা, বনে বনে ফুলের সমারহ, কোকিলের মিষ্টি সুর, নির্মল বাতাস সবই ফাল্গুনের আপরূপ শোভা। তাই ফাগুনে সবার মনে বৈচিত্র্যময় আনন্দের দোলা।  কৃষিতেও রয়ে যায় নানা বৈচিত্র্য।

বোরো ধান

বোরো ধানের বাড়ন্ত অবস্থা।  ধানের চারার বয়স ৫০-৫৫ দিন হলে ইউরিয়া সারের শেষ কিস্তি উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। সার দেয়ার আগে জমির আগাছা পরিস্কার করে নিতে হবে এবং জমির পানি সরিয়ে দিতে হবে। যদি আপনার জমিতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহার করে থাকেন তবে ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। তবে মনে রাখা ভালো এলসিসি ব্যবহারের মাধ্যম্যে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হলে ইউরিয়া সাশ্রয় হবে পাশাপশি ফলনও ভালো হবে। ধানের কাইচ থোড় আশা থেকে শুরু করে ধানের দুধ আসা পর্যন্ত জমিতে ৩-৪ ইঞ্চি পরিমাণ পানি ধরে রাখা প্রয়োজন। এ সময় বোরো ক্ষেতে রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয়ে থাকে।

রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইপিএম পদ্ধতি অবলম্বন করা ভাল। আলোক ফাঁদ পেতে, পোকা ধরার জাল ব্যবহার করে, ক্ষতিকর পোকার ডিমের গাদা নষ্ট করে, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করে পোকা নিয়ন্ত্রন করতে পারেন। এ ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করে পোকা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে  সঠিক বালাইনাশক সঠিক পদ্ধতিতে, সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক সময়ে প্রয়োগ করে পোকা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

আউশ ধান

এ মাসের শেষের দিকে বৃষ্টি নির্ভর উচ্চফলনশীল আউশ হিসেবে ব্রি ধান২৬, ব্রি ধান২৮ এবং সবচেয়ে ভালো জাত ব্রি ধান৪৮ জাতের ধান চাষ করতে পারেন। তাই আদর্শ বীজতলার মাধ্যমে হালিচারা তৈরি করতে হবে। ২০ থেকে ২৫ দিন বয়সী চারা মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। 

ফাল্গুন মাসের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে গম পাকা শুরু করে। পাকা গম গাছ এ সময় খড়ের মতো রঙ ধারণ করে এবং বাতাসে এক রকম ঝনঝন আওয়াজ হয়। তবে গম ফসল কাটার আগে যে জাতের চাষ করা হয়েছে সে জাত ছাড়া অন্য জাতের গম সতর্কতার সাথে তুলে ফেলতে হবে। তানাহলে ফসল কাটার পর বিজাতের মিশ্রণ হতে পারে। বীজ ফসলের জন্য বিজাত বাছাই করা খুবই জরুরি। সকালে বা পড়ন্ত বিকেলে ফসল কাটা উচিত। বীজ ফসল কাটার পর রোদে শুকিয়ে খুব তাড়াতাড়ি মাড়াই-ঝাড়াই করে নিতে হবে। দেরি হলে বীজের আর্দ্রতা বেড়ে যেতে পারে ফলে রোগ ও পোকার আক্রমণ বেশি হবে। সংগ্রহ করার পর গম বীজ ভালো করে শুকিয়ে ঠান্ডাা করে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত পাটের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। পাট চাষের জন্য উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করে আড়াআড়ি ৫-৬ টি চাষ ও মই দিয়ে জমি ভালো ভাবে তৈরি করে নিতে হবে। ভাল ফলনের জন্য ভালো জাত নির্বাচন করতে হবে। পাটের ভালো জাত গুলির মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো ও- ৯৮৯৭, ওএম-১, সি-ি৪৫, বিজেসি-৭৩৭০, এইচ এস- ২৪, এইচসি- ৯৫। স্থানীয় বীজ ডিলার বা ব্যবসায় দের নিকট থেকে আলাপ করে আপনার প্রয়োজনীয় জাত সংগ্রহ করতে পারেন। বীজ সারিতে বুনলে প্রতি কেযার জমিতে ৪৮৫-৫০০ গ্রাম এবং ছিটিয়ে বুনলে ৭৯০-৯১০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। সারিতে বপন করতে হলে সারির দূরত্ব ৭-১০ সেমি. রাখতে হবে।

আপনি যদি ভূট্টা চাষ করে থাকেন তবে জমিতে ৭০-৮০ ভাগ গাছের মোচা খড়ের রঙ ধারণ করলে এবং পাতার রঙ কিছুটা হলদে হলে মোচা সংগ্রহ করতে পারেন। শুকনো আবহাওয়ায় অর্থাৎ বৃষ্টি শুর হওয়ার আগে মোচা সংগ্রহ করতে পারলে ভালো হয়। সংগ্রহ করা মোচ ভালোভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। ভূট্টার দানা মোচা থেকে ছাড়ানো বেশ কষ্টকর। হস্তচালিত ভূট্টা মাড়াইযন্ত্র দিয়ে খুব সহজে ভূট্টা মাড়াই করা যায়। ভূট্টা গাছ জ্বালানী ও পশু খাদ্য উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই খুব যত্ন সহকারে গাছ তুলে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।

এখন বসতবাড়ির বাগানে জমি তৈরি করে ডাঁটা, কলমিশাক, পুঁইশাক, করলা, ঢেঁড়স, বেগুন, পটল এসব সবজি চাষের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়াও মাদা তৈরি করে চিচিঙা, ঝিঙা, ধুন্দুল, শসা, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়ার বীজ বুনতে পারেন। এসব সবজি চাষের জন্য বেশি পরিমাণে জৈবসার ব্যবহার করতে পারেন। ঝড়-বৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হওয়ার আগেই পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, তেল ও ডাল ফসল ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করে শুকিয়ে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এ সময় জমিতে সবুজ সার হিসেবে বিশেষ করে ধৈঞ্চা চাষের উদ্যোগ নিতে পারেন।

এ মাসে আমের মুকুল আসে। এজন্য আমের বোঁটার রোগ বা পোকার আক্রমণ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। কাঁঠালের ফল পচা ও মুচি ঝরা সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই প্রয়োজনে রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ সময় বাডিং পদ্ধতিতে বরই গাছের কলম করা যায়। এজন্য প্রথমে বরই গাছ ছাঁটাই করতে হয় এবং পরে উন্নত বরই গাছের কুঁড়ি দেশী জাতের গাছে সংযোজন করতে হয়।

এখন মাছ চাষের জন্য পুকুর তৈরি ও সংস্কার করার উপযুক্ত সময়। শীতের পরে এ সময় মাছের বাড়বাড়তি দ্রুত হয়। তাই পুকুরে প্রয়োজনীয় খাবার দিতে হবে এবং জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। মাছ চাষে সাফল্য অর্জন করতে হলে উন্নত পদ্ধতিতে চাষ করতে হবে, সেজন্য প্রয়োজন মৎস্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। তাই আপনার নিকটতম একজন মৎস্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করে মাছ চাষ করুন।

আপনার গবাদিপশুর জন্য প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন এবং কৃমিনাশক ঔষধ এখনই খাওয়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। গবাদিপশুকে উন্নত মানের খাবার খেতে দিতে হবে। যেমন- সবুজ ঘাস, ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র, ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক, সংরক্ষণ করা ভূট্টা গাছ এসব। আপনার গৃহপালিত হাঁস-মুরগির প্রয়োজনীয় ভ্যাক্সিন যদি এখনও দিয়ে না থাকেন তবে দেড়ি না করে এখনই দিয়ে নিন এবং পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করুন

সংকলন: কৃষিবিদ মোহাইমিন।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.