- Advertisement -

পৌষ মাসের কৃষি

বারো মাসের কৃষি

263

- Advertisement -

পৌষ মাসের কৃষি

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

পৌষ শীতের প্রথম মাস । কুয়াশামাখা শীতের বাস্তবতায় এ সময়ে প্রকৃতির উৎপাদিত ফসলে স্বাদ আমাদের রসনা মাতোয়ারা।  প্রকৃতির হিমশীতল আমেজ, পিঠা পুলির ধুম, খেজুরের গুড়ের পায়েস, মাঠে প্রান্তরে কুয়াশা ঢাকা সন্ধ্যা, বিন্দু বিন্দু শিশির জমা সকাল দুপুর বিকাল অন্যরকম আমেজ এনে দেয় জীবন পরিক্রমায়। হাড় কাপানো শীতকে উপেক্ষা করে কৃষকদের মাঠ ‍কৃষির কাজ থেমে নেই।

বোরো ধানের বীজতলার যত্ন পরিচর্যা- এসময়ে বীজতলার আগাছা পরিস্কার, প্রয়োজনীয় সেচ ও নিকাশ, বালাই দমন এবং চারা দূর্বল হলে পরিমাণমতো রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে। শীত বেশি হলে রাতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দিতে হবে। বে যত বেশি সুস্থ সবল চারা রোপণ করা যাবে ফলনও সে হারে বাড়বে। বীজতলায় চারার বয়স ৩৫-৪৫ দিন হলে মূল জমিতে চারা রোপন করতে হবে।

আড়াআড়িভাবে ৪-৫ টি চাষ ও মই দিয়ে জমি কাদাময় করে নিতে হবে আগাছা থাকলে তা ভালো ভাবে পরিস্কার করতে হবে। মই দিয়ে জমি সমান করার আগে সুষম মাত্রায় জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। জমির উর্বরতা ভেদে সারের মাত্রা ভিন্ন রকম হয়।  জমির মাটি পরীক্ষা করে সারের মাত্রা জেনে সে মোতাবেক সার ব্যবহার করবেন। বীজতলা থেকে সাবধানে চারা তুলে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২৫ সে.মি. এবং গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সে.মি. দূরে দূরে চারা রোপন করতে হবে। প্রতি গোছায় সুস্থ সবল সর্বোচ্চ ২-৩ টি চারা রোপন করা হলে ফলন ভাল হয়। মনে রাখতে হবে ভালো চারা, সঠিক সময়ে রোপণ, সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার, সুষ্ঠু সেচ ব্যবস্থাপনা, বালাই ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ও পরিমিত পানি সেচ এবং পরিচর্যা করতে পারলে অধিক ফলন ঘরে তোলা যায় ।

শীতে বাহারি সব্জির বর্ণিল রঙে চারদিক একাকার। নিয়মিত পরিচর্যা করতে পারলে শীত মৌসুমে শাকসব্জির বেশি ফলন পাওয়া যাবে। শাক জাতীয় ফসল যেমন লালশাক, মুলা, পালংশাক, ধনে পাতা এসব একবার শেষ হলে আবার বীজ বুনে দিতে পারেন কারণ এই সবজিগুলি অল্প সময়ে ফলন পাওয়া যায়। এছাড়া ফুলকপি, টমেটো, বেগুন, বাঁধাকপি, গাজর, লাউ, শিম, কুমড়া এসব ফসলের জমির আগাছা পরিস্কার, মাটি তুলে দেয়া, সেচ দেয়া, মাটির আস্তর ভেঙ্গে দেয়া, সারের উপরি প্রয়োগ, বালাই ব্যবস্থাপনা, সময়মত ফসল কাটাসহ অন্যান্য কাজগুলো সময়মত করতে হবে। মনে রাখতে হবে পরিকল্পিতভাবে কৃষি কাজ করতে পারলে উৎপাদন খরচ কম হবে লাভ বেশি হবে। কুমড়া এবং লাউ জাতীয় ফসলে হস্তপরাগায়ন করা হলে ফলন অনেকগুণ বেড়ে যায়।

আপনার জমির গমের চারা বড় হতে শুরু করেছে। গমের তিন পাতা হলে বা চারার বয়স ১৭-২১ দিন হলে গম ক্ষেতের আগাছা পরিস্কার করে হেক্টর প্রতি ৩০-৩৫ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করুন এবং সেচ দিন। সেচ দেয়ার পর জমিতে জো আসলে মাটির উপরের চটা ভেঙ্গে দিতে হবে। তাছাড়া জমিতে কাটুই পোকা, ঘন চারা থেকে অতিরিক্ত চারা তুলে নেয়া, খালি জায়গায় বয়সী চারা মাটিসহ তুলে রোপণ করা হলে গমের ফলন লাভজনক হবে।

আলুর বীজ গজানোর পর চারা গাছের উচ্চতা ১০-১৫ সেমি. হলে ইউরিয়া সারের উপরি প্রয়োগ করা দরকার। দুই সারির মাঝখানে সার ছিটিয়ে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে সারির মাঝের মাটি গাছের গোড়ায় তুলে দিতে হবে। ১০-১৫ দিন পর পর একই ভাবে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দিলে ফলন ভাল হবে। মেঘলা আবহাওয়ায় আলুর নাবী ধসা রোগ বা লেটব্লাইট রেগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। আক্রমণ বেশি হলে ফলন একেবারে নাও হতে পারে। সেজন্য ডায়থেন এম-৪৫, রিডোমিল, ম্যানকোজেব বা এ জাতীয় অন্য কোন উপযুক্ত ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় জমিতে ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। এছাড়াও আলুর জমিতে নিয়মিত সেচ, মালচিং, আগাছা পরিস্কার, পোকা-মাকড় ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সঠিকমত করতে হবে। তবেই অধিক ফলন আশা করা যাবে।

মাঠে এখন তেল ও ডাল জাতীয় ফসলের বাড়ন্ত পর্যায়। খাদ্য, পুষ্টি ও অর্থনীতিতে তেল এবং ডাল ফসলের গুরুত্ব অনেক। এসব ফসলের ফলন আশানুরূপ পেতে হলে আগাছা দমন, সার প্রয়োগ, সেচ প্রদান, বালাই ব্যবস্থাপনা ও আনুষঙ্গিক কাজগুলি সময়মত এবং সঠিকভাবে করতে হবে।

শীতকালে আপনার গবাদিপশুর যত্ন নিন। মাঠে এখন অনেক তাজা ঘাস রয়েছে। নিয়ম মেনে খাওয়ালে গবাদিপশু মোটাতাজা হবে, অতিরিক্ত ও বেশি লাভের যোগান দিতে হলে গবাদিপশু মোটাতাজার কোন বিকল্প নেই। আপনার গবাদি পশুর টিকা, কৃমির ওষুধ, খুরা, তরকা, গলাফুলা বা অন্যান্য রোগের আক্রমণ লক্ষণ সম্পর্কে সবসময় সচেতন থাকতে হবে। হাঁস মুরগির বেলায়ও রানীক্ষেত, কলেরা এসব রোগের আক্রমণ দেখা দিতে পারে। নিজে চিকিৎসা না করে একজন পশু চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

শীতকালে মাছের বাড়বাড়তি কম হয়। খাদ্য খেতেও মাছের অনীহা দেখা যায়। শীতে মাছের ক্ষতরোগ দেখা দিতে পারে। এসবের কারণে এসময়ে পুকুরে মাছের যত্ন পরিচর্যা বেশি করতে হবে। পুকুরে মাছের প্রয়েজনে চুন সার সম্পূরক খাবার এসব পরিমাণমত দিতে হবে। এজন্য একজন মৎস্যবিদ বা অভিজ্ঞ মাছ চাষির পরামর্শ মোতাবেক মাছ চাষ করা হলে অধিক লাভবান হবেন।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.