- Advertisement -

বিন্দা মইয়ের সুখস্মৃতি

কৃষিজ ঐতিহ্য: বিন্দা মই, নিড়ানি যন্ত্রসমূহ

718

- Advertisement -

 

বিন্দা মইয়ের সুখস্মৃতি

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

ফসলের জমিতে জন্মানো অনাকাংখিত গাছকেই আগাছা বলে। আগাছা ফসলের মারাত্মক দুশমন। ফসলের  বৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য আগাছা অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক। আগাছা ফসলের ফলন কমানোর পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বৃদ্ধি করে। আগাছা নিয়ন্ত্রণে কৃষকেরা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধরনের নিড়ানি ব্যবহার করে আসছে। নিড়ানিগুলো এলাকাভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন ধরন ও বিভিন্ন নামে পরিচিত। অধিকাংশ নিড়ানিসমূহ মানুষ হাতে চালনা করে থাকে। ইদানিং স্বল্পপরিসরে ইঞ্চিন চালিত নিড়ানিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিড়ানির উদ্দেশ্য
নিড়ানি একটি প্রাচীনতম কৃষি যন্ত্র। নিড়ানি দেওয়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো ফসলের ক্ষেতে আগাছা দমন ও মাটির ওপরের শক্ত আস্তরণ ভেঙ্গে দেয়া। এতে আগাছা পরিষ্কার হয় ও মাটিতে আলো বাতাস চলাচল সহজতর হয়। ফলে মাটিতে থাকা অণুজীবগুলো সহজেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। মাটিতে থাকা ফসলের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান সহজলভ্য হয়। সর্বোপরি মাটির গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ফসলের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত হয়। নিড়ানির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে মূল জাতীয় ফসল যেমন মিষ্টি আলু, আলু তোলা, সবজি জাতীয় ফসলের চারা লাগানো, গাছের গোড়ায় মাটি দেয়া বা সরিয়ে নেয়া, নালা পরিস্কার করা, আইল পরিস্কার করা এসব ।

নিড়ানি পরিচিতি
আমাদের দেশে ব্যবহৃত নিড়ানিগুলোর মধ্যে ছেনী, নিড়ি, পাশনি, খুরপি, আঁচড়া, মেন্দি ছেনী, কাস্তে এবং বিন্দা মই খুবই জনপ্রিয়। নিড়ানিগুলোর দুটো অংশ থাকে। একটি অংশ কাঠের তৈরি যা হাতল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অন্য অংশটি লোহা বা স্টীলের তৈরি ব্লেড যা মূলত মাটি আঁচড়ানোতে সহযোগিতা করে। হাতলে কাঠের অংশটি অধিকাংশ সময়ে কৃষক নিজেরাই তৈরি করলেও লোহা বা স্টীলের তৈরি ব্লেডটি মূলত কামার সম্প্রদায় তৈরি করেন। এসব নিড়ানিসমূহ শাক-সবজি ক্ষেত, আউশ ধান ক্ষেত, পাট ক্ষেত, আনারস বাগানে আগাছা পরিষ্কার করতে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনায় বোরো ও আমন ধান ক্ষেতের আগাছা নিধনের জন্য উইডার বিশেষ করে জাপানীজ রাইস উইডার ও শক্তি চালিত উইডার ব্যবহার হয়ে থাকে। এসব নিড়ানিগুলোর মধ্যে গঠন ও ব্যবহার বিধিতে বিন্দা মই একটু ব্যতিক্রম।

বিন্দা মই
বিন্দা মই মূলত এক ধরনের নিড়ানি। তবে গতানুগতিক নিড়ানিগুলো থেকে একটু আলাদা। এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন নাম থাকলেও বিন্দা বা লাঙ্গল্যা বা আঁচড়া নামেই বেশি পরিচিত। এ দেশের বিভিন্ন জেলা যেমন ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, ব্রাহ্মমবাড়িয়া, টাঙ্গাইল জেলায় একটু বেশিই ব্যবহার হয়ে থাকতো। বিন্দা মই মূলত পাট ও আউশ ধান ক্ষেতে আগাছা দমন ও মাটির ওপরের আস্তরণ ভেঙ্গে দেয়ার কাজে বেশি ব্যবহার হতো। বিন্দার মূল অংশটি কাঠ বা বাঁশের তৈরি, মূল অংশের সাথে কাঠ বা বাঁশের তৈরি খিল বা দাত লাগানো থাকে। হাতলের অংশটি কাঠের তৈরি অনেকটা লাঙ্গলের মতো দেখতে, মাঝে বাঁশের তৈরি বীম বা ইশ জোয়ালের সাথে বাঁধা হয়। বিন্দা মইটি দুটি গরুর সাহায্যে টানা হয়ে থাকে। সময়ের আবর্তে বোরো ধানের প্রাধান্য বিস্তার, আউশ ধানের চাষাবাদ কমে যাওয়া এবং পাটের আবাদ হ্রাস পাওয়ায় বিন্দা মইয়ের ব্যবহারও কমে গেছে। যদিও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তরে এখনো বিন্দা মইয়ের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার সাহতা ইউনিয়নের কদমদেউলী গ্রামের স্বনামধন্য কৃষক জনাব জাহেদ সাহেব এখনোও সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। গত ১৬ এপ্রিল ২০১৮ খ্রি. মাঠ ফসল সরেজমিন পরিদর্শনের সময় পাট ক্ষেতে (কেনাফ) বিন্দা মই দেয়া অবস্থায় উনাকে দেখতে পাই। উনার সাথে বিন্দা মই নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে অবলীলায় তিনি বলতে থাকলেন, বাপ-দাদা হতে প্রাপ্ত ঐতিহ্যের কথা। তিনি বললেন, চারপাশে সব জমিগুলোতে এক সময় পাট ও আউশ ধান চাষ করা হতো। তখন বাবা, চাচা ও দাদাগণ মিলে দলবেঁধে চৈত্র মাসের শেষ হতে বৈশাখ মাসের প্রথম দিক পর্যন্ত বিন্দা মই দিত। একবার ক্ষেতের উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে দেয়ার পরের দিন রোদ্র থাকা সাপেক্ষে পূর্ব থেকে পশ্চিম বরাবর বিন্দা মই দেয়া হতো। এতে আগাছা নিধনের পাশাপাশি মাটির আস্তরণ ভেঙ্গে যেত, ফলে মাটিতে আলো বাতাস প্রবেশ করত এতে পাট ও আউশ ফসলগুলো কয়েক দিনেই তরতর করে বেড়ে ওঠতো। এখন কৃষকরা আর আগের মতো পাট ও আউশ ধান চাষ করে না। তাছাড়া বিন্দা দেয়ার ফলে চরম রোদে ঘর্মাক্ত শরীর নিয়ে গাছের সুশীতল ছায়ায় বসে বিশ্রাম নেয়া সবই এখন স্বপ্নের মত মনে হয়। তিনি খানিকটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। উর্ধ্বশ্বাস ফেলে বলেন, এখন চারপাশ বোরো ধান ক্ষেত জায়গা করে নিয়েছে।

বিন্দা মই ও নস্টালজিয়া
কাকতালীয়ভাবে গত ১৩ এপ্রিল ২০১৮ খ্রি. তারিখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত দেশের একমাত্র কৃষি মিউজিয়ামে ঘুরতে গিয়েছিলাম। সেখানে কৃষকের বসতবাড়ী সংক্রান্ত সেকশনে বিন্দা মইটি চোখে পড়ে। নিজেও আবেগতাড়িত হয়ে আমার নিজের জেঠা মৃত আব্দুল বাছিত ও মৃত আব্দুল মজিদের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। মনে পড়েছিল হাজারো স্মৃতি, বিন্দা মইয়ের ওঠে চড়ে বেড়ানোর কথা। জেঠাগণ আদর করে বিন্দা মইয়ে তুলে সারা ক্ষেতে ঘুরাতেন। এতে আমরা যেমন আনন্দ পেতাম, তেমনি ভার হিসেবেও আগাছা নিধন ও মাটির আস্তরণ ভাঙ্গতে সহযোগিতা হতো। গ্রামে ছিলাম তাই কখনো নাগরদোলা বা আধুনিক যুগের ফ্যান্টাসি কিংডমে যে রাইউ রয়েছে তাতে কখনো চড়ার সৌভাগ্য হয়নি তবে এখন মনে পড়ছে সেদিনের সেই পাট ক্ষেত বা আউশ ধান ক্ষেতে বিন্দা মইয়ে সারা ক্ষেতজুড়ে চড়াটা আজকের দিনের আধুনিক রাইডের চেয়ে কোন অংশেই কম ছিলনা।
ফসলের টেকসই ও উৎপাদশীলতা নিশ্চিত করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই। তবুও বিন্দা মই কৃষি জাদুঘরে নয় বরং নব সংস্করণে কৃষকের মাঠে বেঁচে থাকুক অনাদি অনন্তকাল।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.