- Advertisement -

মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার

জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার

1,788

- Advertisement -

 

মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

মাটি উদ্ভিদ উৎপাদনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মাটি গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রধান উপাদান হলো জৈব পদার্থ। একে মাটির প্রাণশক্তি বা সকল পুষ্টি উপাদানের স্টোরহাউস বা গুদামঘর বলা হয়। মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাগুণ উন্নয়নে ইহা খুব গুরুত্ব বহন করে। নিবিড় শস্য উৎপাদন কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ীভাবে মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনশীলতা রক্ষার্থে জৈব পদার্থের অনেক অনেক অবদান। মাটির উন্নয়ন সাধনে তথা মাটির গঠন, পানি ধারণ ক্ষমতা, বায়ু চলাচলে উন্নয়ন সাধন করে এবং ক্ষয়রোধ করে। তাছাড়া উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানের প্রধানত নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়াম এর ভান্ডার স্বরুপ। এমনকি ইহা নাইট্রোজেন সরবরাহকারী ব্যাকটেরিয়া (রাইজোবিয়াম, এ্যাজোটোব্যাকটর), কেচো এসব অনুজীব ও জীবের খাদ্য ও শক্তি সরবরাহ করে থাকে। আদর্শ মাটিতে আয়তন ভিত্তিতে গড়ে জৈব পদার্থের প্রয়োজন প্রায় ৫%।

বাংলাদেশের মাটির জৈব পদার্থের বর্তমান অবস্থা

আয়তন ভিত্তিতে আদর্শ মাটিতে প্রায় ৫ শতকরা ভাগ জৈব পদার্থ থাকা প্রয়োজন। মধ্যম মাত্রার মাটিতে গড়ে প্রায় ২.৬ ভাগ জৈব পদার্থ থাকা আবশ্যক। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ গড়ে ২ ভাগ এর কম। বাংলাদেশের মাটিতে ভূমি শ্রেণীভিত্তিক জৈব পদার্থের পরিমাণ উচু জমিতে প্রায় ৫.৫ ভাগের বেশি, মাঝারি উচু জমিতে প্রায় ৩.৫ ভাগ থেকে ৫.৫ ভাগ পরিমাণ, মাঝারি নিচু জমিতে ১.৮ ভাগ থেকে ৩.৪ ভাগ, নিচু জমিতে প্রায় ১.০ ভাগ থেকে ১.৭ ভাগ এবং অতি নিচু জমিতে প্রায় ১.০ ভাগের নিচে জৈব পদার্থ পাওয়া যায় (ফার্টিলাইজার রিকোমেন্ডশন গাইড-২০১২)। তাছাড়া বর্তমানে দেশের শতকরা প্রায় ৩৯.৪১ ভাগ জমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ১% বা এর কম এবং শতকরা ৫৩.৮৬ ভাগ জমিতে ইহা ২% এর কম। দেশের প্রায় শতকরা ৯৩.২৭ ভাগ জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় জৈব পদার্থের ঘাটতি আছে।

মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার কারণসমূহ

কৃষি ক্ষেত্রে প্রচলিত দীর্ঘস্থায়ী সমস্যগুলোর মধ্যে কৃষি জমির জৈব পদার্থ কমে যাওয়া অন্যতম সমস্যা। অপরিকল্পিত চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে একসময় মাটির প্রাণশক্তি তথা উৎপাদিকাশক্তি অবিশ্বাস্যভাবে কমে যাবে। মাটিতে জৈব পদার্থ কমে যাওয়ার আরোও কারণগুলি হলো- যেসব উৎস থেকে মাটিতে জৈব পদার্থ জমা হয় তার মধ্যে রয়েছে ফসলের পরিত্যক্ত অঙ্গ, আগাছার দেহাবশেষ, জীবাণু ও কীটপতঙ্গের দেহাবশেষ, প্রয়োগকৃত জৈব সার এবং অন্যস্থান থেকে পানি বা বাতাসবাহিত হয়ে আসা জৈব আবর্জনা জমিতে প্রয়োগ না করা। তাছাড়া ভূমিক্ষয় এবং অপরিকল্পিতভাবে ভূমি চাষাবাদ করা। শস্য বিন্যাস অনুসরণ না করা। সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার না করলে জৈব পদার্থের ঘাটতি দেখা দেয়া। অবিবেচকের মত জমির নিবিড় ব্যবহার করা। প্রচুর আগাছার বিস্তার ঘটানো। ফসলের অবশিষ্টাংশ ও গোবর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা। নিয়মিতভাবে জৈব সার ব্যবহার না করা। মাটির অম্লমান নিয়ন্ত্রণ না করলে জৈব পদার্থের ঘাটতি দেখা দেয়।

মাটিতে জৈব পদার্থের প্রয়োজনীয়তা

মাটিতে পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সঞ্চিত রাখে। ফসল চাষ উপযোগী আদর্শ মাটির বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ করে। মাটির রস ধারণ ক্ষমতা ও উদ্ভিদকে রস সরবরাহ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। জৈব পদার্থ মাটিতে পুষ্টি উপাদানের আধার হিসেবে কাজ করে। নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাসিয়াম ছাড়াও সালফার এবং অন্যান্য গৌণ পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকে। জৈব পদার্থ বিয়োজনের ফলে উদ্ভিদেও পুষ্টি উপাদান ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের হরমোন ও এন্টিবায়োটিক উৎপন্ন করে যা উদ্ভিদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। মাটির অম্লমান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ইহা মাটিতে থাকা বিভিন্ন অুুজীবের শক্তির উৎস হিসেবেও কাজ করে। তাছাড়া মাটিতে বসবাসকারী বিভিন্ন জীব কেচো, পিপড়া ও ইদুর এসবে খাদ্য সরবরাহ করে। এসব প্রাণী তাদের জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনে মাটিকে উলট পালট করে। এতে মাটি নরম হওয়ার পাশাপাশি মাটির আন্ত:নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও রন্ধ্রতা উন্নত হয় ফলে উদ্ভিদের মূলে সহজেই অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি পায়।

মাটির জৈব পদার্থের ব্যবস্থাপনা

মাটির জৈব পদার্থ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং মাটির উৎপাদনশীলতা রক্ষা করতে তা নিয়মিত পূরণ করা আবশ্যক। মাটির জৈব পদার্থের উৎসগুলো হচ্ছে প্রাণিজ সার, ফসলের অবশিষ্টাংশ, গৃহস্থলি ও খামারের ময়লা-আবর্জনা, শহরের নর্দমার কাদামাটি ও আবর্জনা, কারখানার বর্জ্য, সবুজ সার আর অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের জৈব আবর্জনা।
ফসলের পরিত্যক্ত অংশ: ফসল সংগ্রহের পর গোড়ার যে অংশটুকু থাকে তাই ফসলের পরিত্যক্ত অংশ। ফসল সংগ্রহের পর ঐ অংশ গুলো অনেকেই লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে বা জমি পরিস্কারের নামে তুলে ফেলা হয়। অথচ এসব অংশে প্রচুর জৈব পদার্থ ও উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান থাকে। পরিত্যক্ত অংশগুলোকে পচিয়ে, মালচিং করে বা সরাসরি জমিতে মাটির সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।

প্রাণিজ সার: গৃহপালিত পশুপাখির মলমূত্র ও গবাদিপশুর ব্যবহৃত বিছানা হলো প্রাণিজ সার। গোবর হচ্ছে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট প্রাণিজ সার। দু:খজনক হলেও সত্যি, গোবরের একটি বৃহৎ অংশ দেশে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। টাটকা বা কাচা অবস্থায় এসব গোবর বা অন্যান্য আবর্জনা ব্যবহার করা ঠিক নয় এতে প্রাণিজ সার অপচয় হয়। সঠিকভাবে পচিয়ে এই সার ব্যবহার করা উচিত।

কম্পোস্ট: উদ্ভিদ ও প্রাণীর বিভিন্ন উচ্ছিষ্টাংশ পচিয়ে যে জৈব সার প্রস্তুত করা হয় তাই কম্পোস্ট। সাধারণত মরাপাতা, আগাছা, কঢ়ুরিপানা, গৃহস্থালীর উচ্ছিষ্টাংশ, শহুরে আবর্জনা, করাতের গুড়া, চামড়া মিলের আবর্জনা, আখ কলের আবর্জনা, ধানের তুষ, চালের কুড়া এসবই কম্পোস্ট তৈরির মূল উপকরণ। এসব উপাদানগুলো স্তরে স্তরে সাজাতে হয়। প্রতিটি স্তর ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পুরু হয়। ১.২ থেকে ২.০ মিটার প্রস্থে এবং ১.৫ মিটার উচু হতে হয়। স্তরের উপরিভাগ মাটির প্রলেপ দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিতে হয়। নিয়মিত বিরতিতে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। সম্পূর্ণ পচতে প্রায় ১.৫ থেকে ২ মাস সময় লেগে যায়। আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে সময় আরোও বাড়তেও পারে। উচ্চ তাপমাত্রা ও অধিক আর্দ্রতা দ্রুত পচনে সহযোগিতা করে। অল্প পরিমাণ ইউরিয়া, টিএসপি প্রয়োগ করলে দ্রুত পচে। এই কম্পোস্ট ব্যবহারে মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি পায়।

কেঁচো সার : কেঁচো ব্যবহার করে জৈব আবর্জনা, গৃহস্থালির উচ্ছিষ্টাংশ ও আবর্জনাকে মূল্যবান কম্পোস্টে পরিণত করাই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার।

ঘনীভূত জৈব সার : খৈল, কসাইখানার আবর্জনা, মাছের গুঁড়া, হাস-মুরগির বিষ্টা এসব পদার্থগুলো হলো ঘনীভূত জৈবসার।
সবুজ সার: বিভিন্ন উদ্ভিদ বা শস্য জমিতে জন্মিয়ে এর বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় তাকেই সবুজ সার বলে। এক্ষেত্রে লিগিউমিনাস বা শুঁটি পরিবারের উদ্ভিদকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ধৈষ্ণা, আফ্রিকান ধৈষ্ণা, শনপাট, ফেলন, খেসারি, মাসকলাই, মুগবিন, সয়াবিন উদ্ভিদ গুলো সবুজ সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সবুজ সার উদ্ভিদের বয়স ৫০ থেকে ৫৫ দিন হলেই তা চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হয়। রোপা আমনের চারা রোপনের এক সপ্তাহ পূর্বে ধৈষ্ণা মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। সবুজ সার উদ্ভিদের ১০ থেকে ১২ টন বায়োমাস (কাঁচা ওজন) হেক্টর প্রতি ৬০ থেকে ৯০ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে সরবরাহ করে থাকে। তাছাড়া অ্যাজোলা, নীলাভ সবুজ শ্যাওলাও মাটিতে যথেষ্ট পরিমাণ জৈব পদার্থ যোগ করে।

জৈব পদার্থ হচ্ছে মাটির প্রাণ। জৈব সার ব্যবহারে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়ে। মাটির উর্বরতা বাড়ায়। মাটির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। মাটিতে গাছের অনেক খাদ্য উপাদানের ঘাটতি পূরণ করে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, গুনগত মান বাড়ায় এবং গুদামজাত শস্যের সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই মাটির স্বাস্থ্যের প্রতি সকলের বিশেষ নজর দেয়া উচিত।

——-

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.