- Advertisement -

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা

989

- Advertisement -

খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা

কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

খাদ্য নিরাপত্তা
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। এ মৌলিক অধিকার রক্ষা তথা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রবেশাধিকার ও পুষ্টির সামগ্রিক রুপকে বলা হয় খাদ্য নিরাপত্তা। খাদ্য নিরাপত্তা বলতে একটি দেশ, সমাজ বা পরিবারের প্রত্যেকটি মানুষের কর্মক্ষম ও সুস্থ জীবন পরিচালনার জন্য চাহিদা ও পছন্দ অনুযায়ী সব সময়ে যথেষ্ট পরিমাণ নিরাপদ ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকাকে বুঝায় (এফএও)। সুতরাং, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি শুধুমাত্র ভাত-প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, তথা চাল বা ধান উৎপাদনে কোনো দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্জনকে না বিবেচনা করে, পুষ্টি সরবরাহকারী সকল ধরনের খাদ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তাকেও বুঝিয়ে থাকে। খাদ্য নিরাপত্তা হলো এমন এক অবস্থা, যখন খাদ্যের যথেষ্ট মজুদ থাকবে, মানুষের কাছে সে খাদ্যের সহজপ্রাপ্যতা থাকবে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সে খাদ্য পাওয়া যাবে। কাজেই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি এবং যথাযথ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার অবস্থান
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় এর জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭ (সাত) কোটি। তারপরও খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। সময়ের সাথে জনসংখ্যা দ্বিগুনেরও বেশি, আশংকাজনকহারে জমির পরিমাণও কমেছে তারপরও দানাদার শস্যখাদ্য তথা চাল উৎপাদনের আজ আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিদেশেও রপ্তানি করছি। কৃষক-ক্ষেতমজুর, কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানীদের একান্ত চেষ্টার ফলে বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে এ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সবচেয়ে অবাকের বিষয় হলো, ধান উৎপাদনে বিশ্বে আমরা চতুর্থ, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আলু উৎপাদনে ৭ম, আম উৎপাদনে ৮ম, ছাগল উৎপাদনে ৪র্থ, মাছ উৎপাদনে ৪র্থ। তারপরও আমাদের আত্মতুষ্টির কোন সুযোগ নেই, কেননা আমরা এখনও পুষ্টি ও গুণগতমানের খাবার উৎপাদন ও গ্রহণে অনেক পিছিয়ে আছি। তাছাড়া আমরা এখনও খাদ্য অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারিনি। খাদ্য নিরাপত্তায় শস্য খাদ্যে আজ আমরা একটা শক্তিশালী পর্যায়ে কিন্তু পুষ্টি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। সুস্বাস্থ্যের জন্য জনপ্রতি আমাদের প্রতিদিন প্রায় ২৫০ গ্রাম শাকসবজি, ১২৫ গ্রাম ফল, প্রায় ৫০ গ্রাম প্রোটিন, ৩৫ থেকে ৪০ গ্রাম শর্করা, ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম আশ, ১ চা চামচের নিচে আয়োডিনযুক্ত লবন খাওয়া দরকার। অথচ আমরা প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম শাকসবজি, ৪০ থেকে ৪৫ গ্রাম ফল, ১৫ গ্রাম শর্করা আহার করার সুযোগ পেয়ে থাকি।

বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অনেক সাফল্য দেখালেও বর্তমানে যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, তা চলতে থাকলে আগামী ২০৩০ সন নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বার্ষিক প্রায় শতকরা এক ভাগ হারে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। বর্ধিত এ জনসংখ্যার বিভিন্ন চাহিদা- ঘর-বাড়ী, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদি মেটানোর পর খুব অল্প জমিই অবশিষ্ট থাকবে, যা কৃষি পণ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা যাবে। সেই অল্প পরিমাণ জমির উৎপাদন দিয়েই সমগ্র জনগণের খাদ্যের যোগান দিতে হবে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়াবে।

টেকসই উন্নয়ন
টেকসই উন্নয়ন বলতে শুধুমাত্র ভবিষৎ প্রজন্মের চাহিদা পূরণের জন্য বর্তমান প্রজন্মের ভোগ সীমিতকরণকেই বোঝায় না বরং এটি সংখ্যালঘিষ্টের অটেকসই ভোগের কারণে বর্তমান প্রজন্মের অবশিষ্ট জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রক্রিয়া যেন বাধাগ্রস্থ না হয় সেটিও নিশ্চিত করে। টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো পরিবেশের সাথে খাপখাইয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং তা সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সমবন্টিত। মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহ যেমন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, পানি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার প্রয়োজন মিটিয়ে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি করা। তাই টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা হলো পরিবেশবান্ধব কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণকেই বুঝায়।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায়
ধানের মোট উৎপাদন ও বাজারে চালের প্রাপ্যতা/সহজলভ্যতার বিষয়টি খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান নিয়ামক হিসাবে গণ্য করা হয়। তবে, খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জনগনের পুষ্টিমানের নিরাপত্তার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত। কারণ শুধু বেঁচে থাকলে চলবে না। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকতে হবে। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরী উপাদান সমূহের মধ্যে বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেলের প্রধানতম উৎস্য হল শাক-সব্জী, যা প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভাতের সাথে একান্তই অপরিহার্য।

শাক-সব্জীর নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন ও সার্বিক উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গবেষণা কার্যক্রম জোড়দার করা সহ মাঠ পর্যায়ে চাষীদের উদ্ভূদ্ধকরণ ও সার্বিক সহযোগিতা দান করতে হবে। দানাদার শস্য হিসাবে গমের পাশাপাশি সহজে চাষাবাদ ও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার যোগ্য অধিক ফলনশীল ভুট্টার আবাদ বাড়ানোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। আমিষ সরবরাহের ক্ষেত্রে ডালের বিকল্প নেই। ডাল ফসলের উন্নত এবং রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধক্ষম জাত উদ্ভাবন ও আবাদী এলাকা বৃদ্ধির মাধ্যমে ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। স্নেহ/তৈল জাতীয় খাদ্যের সরবরাহের নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে তৈলবীজ জাতীয় ফসলের উন্নত ও রোগ-পোকামাকড় প্রতিরোধক্ষম জাতের আবাদ ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধির ব্যবস্থা নিতে হবে। সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য মিষ্টি জাতীয় খাদ্যদ্রব্যের (শর্করা) গুরত্ব অনেক। এটা মানুষকে তাৎক্ষনিকভাবে শক্তি যোগায়। শর্করা জাতীয় খাদ্যদ্রব্যের প্রধান উৎস চিনি ও গুড়। বর্তমানে আখের জন্য নতুন জমি বরাদ্দ করা প্রায় অসম্ভব, সেহেতু আমাদের বিকল্প উৎস হিসেবে রাস্তার পাশে পতিত জমি, বেড়িবাধ, রেল লাইনের দুই পাশে, পুকুর পাড়ে, বাড়ির আশেপাশে পতিত জমি এবং জমির আইলে খেজুর এবং তাল চাষ করে জনগণের চিনি/গুড়ের চাহিদা মেটানো ছাড়াও বিদেশে রপ্তানিও করা যেতে পারে।
পুষ্টিমানের দিক দিয়ে ফলের গুরুত্ব অপরিসীম। বিভিন্ন ফল গাছের নতুন নতুন উচ্চ ফলনদানকারী মাতৃগাছ সৃষ্টি, ফল গাছের নতুন বাগান সৃষ্টি ও পুরনো বাগানের ফল গাছের যথাযথ পরিচর্যা, রোগ পোকা-মাকড় দমনের মাধ্যমে ফলের উৎপাদন বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের দৈনিক খাদ্য তালিকায় ফল ও শাক-সব্জী প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এর প্রধান কারণ কম উৎপাদন ও সঠিক খাদ্য অভ্যাস। তাছাড়া, ফল-মূল এবং শাক-সব্জীর পুষ্টিমান ও সুষম খাদ্যে এগুলোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেনততার অভাব। প্রধান প্রধান ফসলের চাপে শাক-সব্জী ও ফল-মূলের আবাদী জমিও বাড়ানো যাচ্ছে না। কিন্তু আবাদ বাড়াতে হবে। আমাদের আছে ১ কোটি ১৮ লক্ষ বসতভিটা। বসতভিটার ক্ষুদ্র এক খন্ড খালি জায়গায় পরিকল্পিত উপায়ে শীতের সময় চাষ করা সম্ভব লাল শাক, মূলা শাক, পুঁই শাক, টমেটো, ঢেঁড়স ইত্যাদি। খুবই সম্ভব ঘরের চালে, বেড়ায়, ছোট মাচায় ১/২ টি লাউ, শিম, করলার গাছ লাগানো। অনুরূপভাবে বর্ষায় সম্ভব বেগুন, পালং, গীমাকলমী ইত্যদির ছোট বাগান করা এবং চালে, বেড়ায়, ফলের গাছে ও মাচায় চাল কুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গার ২/৪টি গাছ লাগানো। এসব শাক-সব্জির পাশাপাশি প্রতিটি বাড়িতেই পরিকল্পিতভাবে ২/১টি পেঁপে, লেবু, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা ইত্যাদি ফলের গাছও লাগানো সম্ভব। কাজে লাগে এমন ২/৪টি ওষুধি গাছ লাগানোও সম্ভব।
প্রোটিন বা আমিষ সরবরাহের প্রধানতম উৎস্য মাছ, মাংশ, ডিম ও দূধের সংস্থান করাও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের সকল হাজামজা পুকুর-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় এর সংস্কার করে সেচের পানির সংস্থানের সাথে সাথে পরিকল্পিতভাবে উন্নত প্রজাতির মাছ চাষাবাদের মাধ্যমে অধিক পরিমান মাছ উৎপাদনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। গ্রামের প্রান্তিক চাষী ও দরিদ্র জনগকে উপযুক্ত বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে, প্রয়োজনীয় স্বল্প পুঁজি সরবরাহের মাধ্যমে মধ্যে হাঁস-মুরগী ও ছাগল পালনের আগ্রহী করে তুলতে হবে। পোল্ট্রি ফার্মে হাঁস-মুরগীর মড়ক নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে যথাসময়ে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। ডেয়ারী খামারের উন্নত ব্যবস্থাপনা, নতুন নতুন ডেয়ারী খামার প্রতিষ্ঠা করা, সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ, উন্নত ব্যবস্থাপনায় ঘাস উৎপাদন, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, আখের ছোবড়া ও ভূট্টার গাছ ইত্যাদি জ্বালানী হিসাবে ব্যবহারের পরিবর্তে প্রক্রিয়াজাত করে সাইলেজ জাতীয় উন্নত পশু-খাদ্য সস্তায় সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অধিক সংখ্যক গরু-মহিষ পালন এবং মাংস ও দুধের অধিক যোগান নিশ্চিত হতে পারে।

সর্বোপরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি যৌথ খামার ব্যবস্থাপনা, কৃষি শিক্ষা গবেষণা ও সম্প্রসারণের যৌথ উদ্যোগ, কৃষি উপকরণসমূহের সহজলভ্যতা, সারা বছর ফসল উৎপাদন, অধিক মাত্রায় ফলন নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্য পচনরোধে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক শস্য সংরক্ষন ব্যবস্থাপনা, কৃষি ঋণের পর্যাপ্ততা, জাতীয় সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, পতিত জমির ব্যবহার, বিপনণ তথা ফসলের ন্যায্য মুল্য নিশ্চিত করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নীতকরণ, ফড়িয়া-দালাল বা অসাধু ব্যবসায়ী দমন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা, খাদ্যে ভেজাল রোধ এসব বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।

টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় করণীয়
পরিবেশ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট না করে, প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে বর্তমান প্রজন্মকে খাওয়াব এবং ভবিষৎ প্রজন্মের জন্যও সম্পদ রেখে যাব, সম্পদের এ ন্যায্য বন্টনই হলো টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা। পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, এজন্য মাটির স্বাস্থ্যর প্রতি যতœ রাখতে হবে, পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃক্ষরোপণ করতে হবে, ফলদ বাগান বনজ বাগান এমনকি ঔষধি গাছের বাগান সৃজন করতে হবে, পতিত জমির সুষম ব্যবহার, পরিমিত সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, শস্য আবর্তণ অনুসরণ করতে হবে, পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা, সঠিক সময়ে সঠিক মাত্রায় সঠিক নিয়মে সঠিক বালাইনাশক পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ব্যবহার যুগোপযোগী খাদ্যনীতি ও কৃষিনীতি প্রণয়ন করতে হবে, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ করতে হবে, খাদ্যশস্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

টেকসই কৃষি উন্নয়নে চ্যালেঞ্জ
জনসংখ্যা সমস্যা, নিম্ন মাথাপিছু আয়, বনাঞ্চল ধ্বংসকরণ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিবেশ দূষণ, প্রশাসনিক জটিলতা, বৈদশিক সাহায্য নির্ভরতা, সঞ্চয়ের নিম্ন হার, সম্পদের অসম বন্টন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসব। তাছাড়াও সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জলবায়ু পরিবর্তন তথা উষ্ণতা বৃদ্ধি ফলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, খরা ইত্যাদি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেখা দিচ্ছে বিশ্বে খাদ্য সংকট। এছাড়া ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ খাদ্যশস্যকে জৈব জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করছে, বিধায় বিশ্বের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তার ইস্যুটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই জয়জয়কার অবস্থায় এমনটি আমরা আশা করতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের এখনই সতর্ক হতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ তথা বিশ্বকে রক্ষা করতে হবে। ভূমিক্ষয়, ভূমির উর্বরতা সংরক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজতে হবে।

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারের পদক্ষেপ
দেশে ফসল কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. টেকসই কৃষি প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবনে কৃষি শিক্ষা, কৃষি গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
২. পাটের জিনোম আবিষ্কার ও ছত্রাকের জীবন রহস্য উন্মোচনে বিশেষ সহায়তা প্রদান।
৩. উৎপাদন খরচ কমানোর সার, জ্বালানি ও সেচ কাজে বিদুতের ভর্তুকি প্রদান।
৪. খামার যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান।
৫. কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদান ।
৬.ফসল উৎপাদনে কৃষি প্রণোদনা ও কৃষি পুনর্বাসন কাযর্ক্রম চালু।
৭. ১০ টাকায় কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলা।
৮. বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র সেচ কার্যক্রম জোরদার করেছে। ড্যাম, পাহাড়ে ঝিরি বাঁধ, রাবার ড্যাম ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে।
৯. কৃষি পণ্যের বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন বর্তমান সরকারের আরেকটি সাফল্য। পাইকারি বাজার সৃষ্টি, গ্রোয়ার্স মার্কেট, কুল চেম্বার স্থাপন, রিফার ভ্যান পণ্য বিপণন, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ইত্যাদি
১০.সরকার অঞ্চলভিত্তিক ১৭টি সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকা উপযোগী ফসলের জাত উন্নয়ন, সম্ভাবনাময় কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, সেচ অবকাঠামো নির্মাণ করে সেচের আওতা বৃদ্ধি করা, কৃষিজাত পণ্যের বাজার সুবিধা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে।
১১. পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
১২. দেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকার কৃষির সার্বিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ২০১৩ সনে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এ মহাপরিকল্পনার আওতায় দক্ষিণাঞ্চলের ১৪টি জেলায় সামগ্রিকভাবে ফসল, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতসহ ১০টি প্রধান ক্ষেত্রে কর্মকা- শুরু হয়েছে।
১৩. দেশে বর্তমান সরকারের আমলে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে।
১৪. দেশে মাটির উর্বরতা অনুযায়ী অনলাইন সুষম সার সুপারিশ করার জন্য ২০০টি উপজেলায় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তাছাড়া দেশে এইজেড ভিত্তিক মডেলিংয়ের মাধ্যমে ১৭টি শস্য উপযোগিতা বিষয়ক ম্যাপ প্রণয়ন করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ কৃষি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মান্ধাতার আমলের কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে বানিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর করা একান্ত কর্তব্য। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কৃষি ব্যবস্থায় দরকার আমূল পরিবর্তণ। প্রয়োজন বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবিত ফসল চাষাবাদের উন্নত প্রযুক্তিসমূহ সমপ্রসারণবিদ, সমপ্রসারণকর্মী, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছে সঠিকভাবে অতি দ্রুত পৌছে দিয়ে তা ব্যবহারে কৃষকদেরকে আগ্রহী ও অভ্যস্থ করে তোলা, কৃষিতে অধিক পরিমাণ বিনিয়োগ, শস্যের অঞ্চলভিত্তিক উফশী জাত উদ্ভাবন ও চাষের ব্যবস্থা গ্রহণ, অধিক উৎপাদন এলাকা থেকে কম উৎপাদন এলাকায় সহজে ও দ্রুত খাদ্য পরিবহনের ব্যবস্থা গ্রহণ, পুনঃগবেষণার মাধ্যমে শস্য পর্যায়ক্রমের পূনর্বিণ্যাস ও শস্য-বহুমূখীকরণ, বিরূপ আবহাওয়ায় উৎপাদনক্ষম শাক-সব্জীর নতুন নতুন উফশী জাত উদ্ভাবন এবং গ্রীণ হাউস/নেট হাউস স্থাপনের মাধ্যমে বিরূপ পরিবেশ/আবহাওয়ায় প্রচলিত উফশী শাক-সব্জী চাষবাদের ব্যবস্থা গ্রহণ, টিস্যু কালচার, জিএম শস্য উৎপাদন, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, কৃষি পণ্যের উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, শস্য বীমা চালু করণ, কৃষি বাজার গঠন, কৃষিজমি অন্যখাতে স্থানান্তর রোধের জন্য সরকারীভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া, কৃষি গবেষণা কাজে নিয়োজিত বিজ্ঞানীদের কাজকে শুধুমাত্র চাকুরী হিসাবে গণ্য না করে তাদেরকে অধিকতর সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে পেশাজীবী মানসিকতা সৃষ্টির ব্যবস্থাগ্রহণ।

সারা বিশ্বে উষ্ণতা বৃদ্ধিকারক গ্যাসের পরিমান কমাতে আমাদের চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি জৈব সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাটির উব্র্বরতা সুরক্ষা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবিলায় কৌশলী হওয়া, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা এবং লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন সংক্রান্ত গবেষণা অব্যাহত রাখতে হবে। সকল ক্ষেত্রে উন্নত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সরকারী উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।

খাদ্যের মূল লক্ষ্য হলো-ক্ষুধা নিবারণের পাশাপাশি পুষ্টিসাধন ও স্বাস্থ্য রক্ষা। টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় করণীয় বিষয়াদিসমূহ বাস্তবায়নের পাশাপাশি আমাদের খাদ্য গ্রহণের অভ্যাসকেও বদলাতে হবে।

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.