- Advertisement -

কৃষি পণ্য (সবজি ও ফলমূল) প্রক্রিয়াজাতকরণ

কৃষি পণ্য (সবজি ও ফলমূল) প্রক্রিয়াজাতকরণ

1,187

- Advertisement -

 

কৃষি পণ্য (সবজি ও ফলমূল) প্রক্রিয়াজাতকরণ

কৃষিবিদ মোহাইমিন

শাকসবজি ও ফলমূল খুবই পচনশীল পণ্য। এসব কৃষি পণ্য বাজারে বেশিদিন থাকে না। ফলমূল ও শাকসবজির অপচয় রোধ কল্পে কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের বিকল্প নেই। বাণিজ্যিকভাবে তো বটেই তবে পারিবারিক পর্যায়ে শাকসবজি ও ফলমূল প্রক্রিয়াজাত করে সংরক্ষণ করলে এসব ফসলের অপচয় অনেকাংশে কমানো যাবে। ফলে পুষ্টি সংরক্ষণ হবে, প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্যদ্রব্য সারা বছরই পাওয়া যাবে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ২৫০ গ্রাম শাকসবজি এবং ১১৫-১২৫ গ্রাম ফল খাওয়ার তাগিদ রয়েছে। অথচ আমরা কতটুকুই বা খাচ্ছি? প্রশ্নটা সবার কাছে রইল। একথা সত্য যা খাচ্ছি তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ। শাকসবজি ও ফলমূল কম খাওয়ার অন্যতম মূল কারণ হলো চাহিদা অনুপাতে উৎপাদন কম, সহজলভ্য প্রাপ্তির অভাব, সারাবছরব্যাপী উৎপাদন না হওয়া, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনায় অপচয় কিংবা নষ্ট হওয়া, কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাব। আমাদের দেশে উৎপাদিত ফলমূল ও শাকসবজির অপচয় কিংবা বিনষ্ট হচ্ছে মোট উৎপাদনের শতকরা ২৫-৪০ ভাগ।
কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের আচার, চাটনি, জ্যাম, জেলী এসব সহজেই তৈরি করা যায়। এতে ফসলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে শাকসবজি ও ফলমূলের অপচয় রোধ তথা পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচন নিশ্চিত হবে।

কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ করার পদ্ধতিসমূহ
১। চিনি ও এসিড সংযোজন করে সংরক্ষণ: সাধারণত জেলী, জ্যাম, মোরব্বা এবং ক্যান্ডি তৈরি করে তা চিনি ও এসিড সংযোজন করে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি সংরক্ষণ করা যায়।
১.১। জেলী
ফলের রস দিয়ে জেলী তৈরি করা যায়। পাকা ফল থেতলিয়ে ফলের রস বের করা হয়। পরবর্তীতে খুব মিহি চালনী বা কাপড় দ্বারা রস ছেঁকে নিয়ে রস সংগ্রহ করা যায়। ছাকনি দ্বারা রসে থাকা ফলের আঁশগুলো আলাদা হয়ে যায়। ছাঁকা রস দিয়ে প্রস্তুতকৃত জেলী খুব পরিস্কার ও স্বচ্ছ হয়। ফল ও সবজিতে অবস্থিত পেকটিন চিনির উপস্থিতিতে রস অথবা পাল্পকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। সাধারণত পেয়ারা, আম, আনারস, আপেল, পেপে, মিষ্টি বেল, কালো জাম, টমেটো এসব থেকে জেলী তৈরি করা হয়। পেয়ারাতে প্রাকৃতিকভাবে পেকটিনের পরিমাণ বেশি থাকে তাই আলাদা করে যোগ করার কোন প্রয়োজন নেই।
১.২। জ্যাম
ফলের পাল্প দিয়ে জ্যাম তৈরি করা হয়। আম, আনারস, কমলালেবু, তাল, মাল্টা এমনকি গাজর, কুমড়া, টমেটো এসব ফল ও সবজি থেকে সহজেই জ্যাম করা যায়। যে সব ফল ও সবজিতে পেকটিন কম থাকে সেসব ফল ও সবজির পাল্পের সাথে কিছু পরিমাণ পেকটিন (০.৪-০.৫%) মিশিয়ে নিতে হবে। মিশ্র ফলের জ্যাম খুবই মজাদার। মিশ্র ফলের জ্যাম তৈরি করার পদ্ধতিটাও একটু ভিন্ন। কম পেকটিনযুক্ত ফলের সাথে বেশি পেকটিনযুক্ত ফলের সমন্বয়ে মিশ্র ফলের জ্যাম প্রস্তুত করা যায়। জেলী ও জ্যাম তৈরি করার সময় পেকটিনের পরিবর্তে লেবুর রস বা সাইট্রিক এসিড ফল/সবজির রসের সাথে মিশিয়ে নেয়া যায়। সাধারণত প্রতি ১০০ গ্রাম পরিমাণ লেবুর রসে প্রায় ৫ গ্রাম পরিমাণ সাইট্রিক এসিড বিদ্যমান থাকে। সাইট্রিক এসিড মূলত তিনটি কাজ করে- প্রথমত এটি ফলের শাঁস থেকে পেকটিন মুক্ত করে, দ্বিতীয়ত খাদ্যের সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ায় ও তৃতীয়ত বেশি মিষ্টি মিশ্রিত খাদ্যের স্বাদ বৃদ্ধি করে।
১.৩। মোরব্বা
ফল বা সবজি টুকরা টুকরা করে চিনির সিরার সমন্বয়ে মোরাব্বা তৈরি করা যায়। এক্ষেত্রে ফল বা সবজিকে প্রথমত টুকরা টুকরা করে নিতে হবে। তারপর চিনির সিরার মধ্যে দীর্ঘসময় চুবিয়ে/ডুবিয়ে রাখতে হয়। অত:পর সিরা নিংড়িয়ে মোরব্বা তৈরি করা হয়। সিরা নিংড়ানোর পর ফল বা সবজির টুকরাগুলোকে যথাসম্ভব শুকিয়ে নিতে হবে। প্রায় শুকনা অবস্থায় মোরব্বা সংরক্ষণ করতে হয়। আম, বেল, চালকুমড়া, আনারস এসব ফল ও সবজির মোরব্বা তৈরি করা যায়।

২। আচার, চাটনী এবং সস তৈরি করে সংরক্ষণ
২.১। আচার
ফল ও সবজিকে হরেকরকম মশলাদি দিয়ে মিশিয়ে, খাওয়ার তেল বা ভিনেগারে ডুবানো অবস্থায় প্রস্তুত খাবারকে আচার বলা হয়। আচারে প্রায় শুকনা করা ফল বা সবজির সাথে সরিষার তেল এবং ভিনেগার মিশিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে ফল বা সবজির জলীয় অংশ বেশ কমে গিয়ে (১২% বা কম) তেল বা ভিনেগার মিশিয়ে দিলে আচারের সংরক্ষণ ক্ষমতা বেড়ে যায়। অর্থ্যাৎ পচন সৃষ্টিকারী জীবাণুগুলোর কার্যক্রম একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। আচার তৈরিতে মসলা হিসেবে সরিষা, আদা, রসুন, হলুদ, মরিচ, মেথি, কালজিরা এসব ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও টক মিষ্টি করার জন্য চিনি এবং এসিটিক এসিড বা ভিনেগার ব্যবহার করা হয়। তন্ডুল জাতীয় খাদ্য যেমন ভাত, রুটি, লুচি, পরোটা এসব খাবারের সাথে অল্প একটু আচার মিশ্রণে খাদ্যকে বেশ মুখরোচক করে তোলে। আচারে ব্যবহৃত সরিষার তেল ও এসিড প্রিজারভেটিভ হিসেবে কাজ করে। সাধারণত কাঁচা আম, আমড়া, জলপাই, চালতা, গাজর, রসুন, ফুলকপি ও বাঁধাকপি, বেগুন, সাতকড়া এসব ফল ও সবজি থেকে আচার তৈরি করা হয়।
২.২। চাটনী
সাধারণত লবণ ও চিনি মিশিয়ে চাটনী তৈরি করা হয়। বিভিন্ন মসলা মিশিয়ে চাটনীর স্বাদ ও সুগন্ধ বাড়ানো যায়। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করার জন্য চাটনীতে সোডিয়াম বেনজোয়েট (০.৬%) মেশানো হয়। চাটনী অর্থে যা চেটে চেটে খেতে হয়; ভাত, রুটি, লুচি এসব তন্ডুল জাতীয় খাদ্যের সংগে অল্প পরিমাণ চাটনী মিশিয়ে খেতে ভাল লাগে। চাটনী অন্যান্য খাদ্যকে বেশ সুস্বাদু ও মুখরোচক করে তোলে। বরই, তেতুল, জলপাই, আম, আমড়া ও চালতা এসব থেকে চাটনী তৈরি করা হয়।

৩। কেচাপ বা সস তৈরি করে সংরক্ষণ:

ফল ও সবজির ঘন শাঁসালে রস বা পাল্পের সংগে বেশি মাত্রায় চিনি, ভিনেগার ও মশলা মিশিয়ে যে খাদ্য প্রস্তুত করে সংরক্ষণ করা হয় সেই খাদ্যকে সস বা কেচাপ বলে। কেচাপ তৈরির সময়ে ফল বা সবজির পাল্প ব্যবহার করা হয়। কেচাপ বা সসে এসিটিক এসিড বা ভিনেগার মিশ্রিত থাকায় এর সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ে। এছাড়াও প্রিজারভেটিভ হিসেবে কেচাপ বা সসে সোডিয়াম বেনজোয়েট ব্যবহার করা হয়। এই খাদ্যগুলো বেশ মুখরোচক। রুটি, পাউরুটি, ঘি বা তেলে ভাজা খাদ্যদ্রব্যের সাথে অল্প পরিমাণ সস বা কেচাপ মিশিয়ে খেতে বেশ ভাল লাগে। সাধারণত পাকা টমেটো, পাকা তেতুল, কাচা আম এসব থেকে সস বা কেচাপ তৈরি করা হয়।

৪। জুস অথবা স্কোয়াশ তৈরি করে ফলের রস সংরক্ষণ:

ফলের রস নিষ্কাশন করে জুস অথবা নেকটার হিসেবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।
৪.১। জুস সংরক্ষণ: ফল বা সবজির রস সংগ্রহ করে তাতে সাইট্রিক এসিড যোগ করে ১০-১৫ মিনিট ফুটিয়ে প্রিজারভেটিভ সংযোজন করে জীবাণুমুক্ত বোতলে ভর্তি করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

৪.২। স্কোয়াশ: ফলের রসের সাথে চিনি, পানি, সাইট্রিক এসিড ও প্রিজারভেটিভ সংযোজন করে স্কোয়াশ তৈরি করা যায়। স্কোয়াশে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে বিধায় খাওয়ার পূর্বে পানি মিশিয়ে নিতে হবে।

৫। চিনির সিরা বা লবণের দ্রবণে সংরক্ষণ:

বাসা বাড়িতে ফলমূল ও শাক সবজি অতি সহজেই কাচের বোতলে সংরক্ষণ করা যায়। সাধারণত ফল চিনি ও সিরায় এবং শাকসবজি লবণের দ্রবণে কাচের বোতলে সংরক্ষণ করা হয়।
৬। চিপস তৈরি করে সংরক্ষণ:

আলু, কলা ও কচু এসব দ্বারা চিপস তৈরি করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। এক্ষেত্রে এসব ফলগুলোকে ফালি ফালি করে কেটে রোদে শুকিয়ে বোতলজাত করে নিতে হয়। পরে শুধু তেলে ভেজে নিলেই হয়ে যায় মজাদার চিপস। ঘরোয়াভাবে খুব সহজেই

কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের আচার, চাটনি, জ্যাম, জেলী এসব সহজেই তৈরি করা যায়।

(তথ্যসূত্র: পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট)।

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.