- Advertisement -

ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা

323

- Advertisement -

 

ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা

ইঁদুর ক্ষতিকারক ইতর প্রাণী। মেরুদন্ডী প্রাণীদের মধ্যে ইঁদুর সবচেয়ে ক্ষতিকর বালাই। মাঠফসল, গুদামজাত শস্য, ফল, শাকসবজি, ঘরের আসবাবপত্র, কাগজপত্র সবকিছুই ক্ষতি করে। ইঁদুর ক্ষতি করার মূল কারণ তার একজোড়া ছেদন বা কর্তন দাঁত। শারীরতাত্ত্বিকভাবেই ইঁদুরের ছেদন দাঁতের বৃদ্ধি অসম্ভব দ্রুত গতিতে হয়ে থাকে। নিয়মিত কাটাকুটি না করলে দাঁত ইঁদুরের মাথা ভেদ করে বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ইঁদুর আপন প্রাণ বাঁচাতেই নির্দয়ভাবে কাটাকুটি করে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ আমাদের কৃষক সমাজ।

ইঁদুর মারার প্রয়োজনীয়তা
চারটি কারনে ইঁদুর নিধন করা প্রয়োজন (ক) ইঁদুর দ্বারা মানুষ ও পশু পাখির মধ্যে মারাত্বক রোগের বিস্তার ঘটে (খ) ইঁদুর মাঠের ফসল, ফল, শাক-সবজি, গুদামের খাদ্য ইত্যাদি খেয়ে ফেলে অথবা নষ্ট করে । (গ) পানির পাইপ, গুদামের জিনিষপত্র, বই পুস্তক ইত্যাদি কেটে নষ্ট করে; বৈদ্যুতিক তার কেটে অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি করে; সেচের গর্ত খুড়ার ফলে পানির অপচয় হয়; সড়ক ও বাধে গর্ত খুড়ে ক্ষতি সাধন করে (ঘ) ইঁদুরের মলমুত্র ও লোম ফেলে পরিবেশকে দুষিত করে। প্রতি বছর ৮-১০ লক্ষ টন খাদ্য শস্য ইঁদুর দ্বারা নষ্ট হয়। মারাত্নক কিছু রোগ প্লেগ, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েড ও চর্মরোগসহ প্রায় ৩০ প্রকার রোগ ইঁদুর দ্বারা বিস্তার ঘটে।

ইঁদুর দমন ব্যবস্থাপনা
দমন ব্যবস্থাটাকে আমরা প্রথমত: দুই ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি অরাসায়নিক পদ্ধতি এবং অপরটি রাসায়নিক পদ্ধতি।

অরাসায়নিক পদ্ধতি
ইদুঁরের ফাঁদ ব্যবহার– বিভিন্ন ধরণের ফাঁদের ভেতর টোপ হিসেবে শুঁটকি মাছ, শামুক পচা, নারকেল কোরা, বিস্কুট, রুটি এসব ইঁদুরের লোভনীয় খাবার, এসব ব্যবহার করে ইঁদুর ধরা যায়।
জমির আইল চিকন রাখা– জমির আইল ছেঁটে ছোট বা চিকন করে রাখতে হবে, যাতে ইঁদুর জমির আইলে গর্ত করে বসবাস করতে না পারে।
ইঁদুরের গর্তে পানি দিয়ে– ইঁদুরের গর্তে পানি ঢেলে ইঁদুর দমন সম্ভব। গর্তে পানি দিলে ইঁদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে পালাতে চেষ্টা করবে, তখন একে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে। গর্ত খনন করে- ইঁদুরের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে অর্থাৎ নতুন গর্তের মাটি খুঁড়ে ইঁদুর দমন করা যায়।
গর্তে ধোঁয়া ব্যবহার করে– শুকনা মরিচ পোড়া ধোঁয়া গর্তে ঢুকিয়ে দিলে ইঁদুর গর্ত থেকে বের হয়ে আসবে, তখন একে পিটিয়ে মেরে ফেলতে হবে।
সমকালীন চাষাবাদ- মাঠে সবাই মিলে একসাথে ফসল রোপণ বা বপন এবং একসাথে কেটে আনলে ইঁদুর অনেক দিন মাঠে খাবার না পেয়ে পরোক্ষভাবে ইঁদুর দমনে সহায়ক হবে।
পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রেখে- ঘরবাড়ি, গুদাম ও জমির আশপাশে আবর্জনা, আগাছা ও ঝোপ-জঙ্গল নষ্ট করে, বাড়িতে উচ্ছিষ্ট বা বাড়তি খাবার যত্রতত্র না ফেলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইঁদুর দমন করা সম্ভব।
প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে- ঘরবাড়ি, খাদ্যগুদাম এবং দালান কোঠায় ধাতবপাত বা তারের জালি দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ইঁদুরের প্রবেশ বন্ধ করা যায়।
বৈদ্যুতিক বাঁধা সৃষ্টি করে- কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় অতি সাবধানতার সাথে তারের বেড়ার মধ্য দিয়ে স্বল্প বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে ইঁদুর দমন সম্ভব।
আঠা ব্যবহারের মাধ্যমে– ইঁদুর ধরার জন্য গুদামে বা ঘরে এক প্রকার আঠা সাধারণত কাঠ বোর্ডে, শক্ত মোটা কাগজ, টিন, প্লাষ্টিকে টাইলস এ ধনের বস্তুতে প্রলেপ দিয়ে ইঁদুর চলাচলের রাস্তায় ব্যবহার করা হয়। ইঁদুর খাবার খেতে এসে আঠার সংস্পর্শে পা, লোম আটকিয়ে যায়, এর ফলে নড়াচড়া করতে পারে না। এ ধরনের আঠা ব্যবহার করে ইঁদুর দমন করা যায়।
কলাপাতার মিডরিভ ফেলে রাখলে– ইঁদুর যেসব রাস্তায় চলাচল করে সেসব রাস্তায় কলাপাতা ছাড়িয়ে যে মিডরিভ থাকে তা দিয়ে দিলে ইঁদুর সাপ মনে করে এই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।
কারেন্ট জাল ব্যবহার– ইঁদুর চলাচলরত রাস্তায় কারেন্ট জাল পেতে রাখলে ইঁদুর জালে আটকে যায় অত:পর তাদের ধরে মেরে ফেলতে হয়।
ইঁদুরের লেজ সংগ্রহের মাধ্যমে– সরকারীভাবে বা বেসরকারীভাবে ইঁদুরের লেজের বিনিময়ে টাকা পয়সা দিয়ে ইঁদুর দমনের ব্যবসাথা করা যেতে পারে।
জৈবনিয়ন্ত্রণ বা পরভোজী প্রাণীর মাধ্যমে– জীবিত কোন প্রাণীকে অন্য কোন জীবিত প্রাণী দ্বারা নিয়ন্ত্রণকেই জৈব নিয়ন্ত্রণ বলে। বিড়াল, বন বিড়াল, শিয়াল, পেঁচা, গুইসাপ, অবিষধর সাপ, বেজি এসব প্রাণীর প্রধান খাদ্য হচ্ছে ইঁদুর। এসকল প্রাণী সংরক্ষণ করে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

তাছাড়াও জমিতে রশি টাঙ্গিয়ে পলিথিন ঝুলিয়ে, কাকতাড়ুয়া ঝুলে দিয়েও ইঁদুর প্রতিহত করা যায়।

রাসায়নিক পদ্ধতি-
প্রথমত তীব্র বিষ দিয়ে ইঁদুর মারা যায়। তীব্র বিষের মধ্যে জিঙ্ক ফসফাইড উল্লেখযোগ্য। পরিমিত মাত্রায় বিষটোপ খাওয়ার পর এক সাথে আনেকগুলো ইঁদুর মারা যায়। পরবর্তীতে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী বিষ। যা খাওয়ার সাথে সাথে ইঁদুর মারা যায় না, ইঁদুর মারা যেতে ৫-১৩ দিন সময় লাগে। দীর্ঘস্থায়ী বিষ দিয়ে তৈরিকৃত বিষটোপ ইঁদুর খাওয়ার পর ইঁদুরের রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে যায়, ইঁদুরের নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে ও আস্তে আস্তে দূর্বল হতে থাকে এবং ৫-১৩ দিনের মধ্যে ইঁদুর মারা যায়। তবে বিষ ব্যবহারে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

আশ্বিন মাসে সারা দেশজুড়ে ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু হয়। আমন ধান রক্ষাসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতির মাত্রা কমানোর জন্য এ অভিযান চলে। এককভাবে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ইঁদুর দমন করলে কোনো লাভ হবে না। ইঁদুর দমন কাজটি করতে হবে দেশের সব মানুষকে একসাথে মিলে এবং ইঁদুর দমনের সব পদ্ধতি ব্যবহার করে। আসুন সবাই একসাথে অতিচালাক আমাদের এ পরম শত্রুটিকে দমন করি।

সংকলনে: কৃষিবিদ মোহাইমিনুর রশিদ

 

- Advertisement -

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়, কিন্তু ট্র্যাকব্যাক এবং পিংব্যাক খোলা.